২০ জানুয়ারি মঙ্গলবার বিকেলে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গণভবনের জায়গায় অবস্থিত জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের চূড়ান্ত পর্যায়ের কাজ পরিদর্শন করেন। তিনি জাদুঘরের নির্মাণের অগ্রগতি, প্রদর্শনী ও ভবিষ্যৎ ব্যবহার সম্পর্কে মন্তব্য করেন এবং জাদুঘরকে জাতির দিকনির্দেশনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে তুলে ধরেন।
ড. ইউনূসের মতে, দেশের কোনো সময় দিশা হারিয়ে গেলে এই জাদুঘরই জনগণকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “আমরা চাই না ভবিষ্যতে আর কোনো জাদুঘর তৈরির প্রয়োজন হোক; যদি জাতি কখনো দিশাহারা হয়, তবে এই জাদুঘরে পথ খুঁজে পাবে।” এ কথায় তিনি জুলাই শহীদদের তাজা রক্তে নির্মিত এই স্মারককে বিশ্বের অনন্য উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
উপদেষ্টা সকল নাগরিককে একদিনের জন্য জাদুঘরে সময় কাটাতে আহ্বান জানান। তিনি শিক্ষার্থীদের দলবদ্ধভাবে এই স্থান পরিদর্শন করার পরামর্শ দেন, যাতে তারা দেশের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া নৃশংসতা ও সংগ্রামের গভীরতা উপলব্ধি করতে পারে। জাদুঘরে তৈরি করা আয়নাঘরগুলোকে তিনি বিশেষ উল্লেখ করেন; সেখানে দর্শকরা কয়েক ঘণ্টা বা একদিন পর্যন্ত থাকতে পারে, যা তাদেরকে অতীতের কষ্টের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করতে সহায়তা করবে।
ড. ইউনূস জোর দিয়ে বলেন, “আয়নাঘরে বসে দর্শকরা বুঝতে পারবে কীভাবে নৃশংসতার মধ্যে বন্দিরা ছিলেন এবং কীভাবে আমরা সবাই একসাথে এমন ঘটনা পুনরাবৃত্তি না হওয়ার জন্য সচেতন হতে পারি।” তিনি এই ধরনের নৃশংসতা আর না ঘটার জন্য জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন এবং সকলকে একসাথে দাঁড়িয়ে এই লক্ষ্য অর্জনের আহ্বান জানান।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ড. ইউনূস অতীতের তরুণ ও ছাত্রদের প্রতিরোধের কথা স্মরণ করেন, যারা কোনো অস্ত্র ছাড়াই ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। তিনি সাধারণ মানুষের সাহসিকতাকে প্রশংসা করে বলেন, “সাধারণ মানুষও নির্ভয়ে, সাহসিকতার সঙ্গে অস্ত্রের মুখে দাঁড়াতে পারে—এটাই আমাদের শিক্ষা।” এ ধরনের বর্ণনা জাদুঘরের শিক্ষামূলক দিককে আরও জোরদার করে।
পরিদর্শনের সময়, ড. ইউনূস জাদুঘরে প্রদর্শিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পেছনের ইতিহাস এবং শীঘ্রই ১৬ বছর ধরে শাসনরত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনকালকে চিত্রায়িত করা উপকরণগুলো ঘুরে দেখেন। তিনি এই উপকরণগুলোকে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ড. ইউনূসের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এছাড়া, সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, আইন উপদেষ্টা ডা. আসিফ নজরুল, গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ডা. খলিলুর রহমানসহ অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
ড. ইউনূসের মন্তব্যের ভিত্তিতে, জাদুঘরটি কেবল স্মৃতিস্তম্ভ নয়, বরং শিক্ষামূলক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি ভবিষ্যতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গবেষণা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে জাদুঘরের ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা উল্লেখ করেন, যাতে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ইতিহাসের সচেতনতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ গড়ে ওঠে।
এই পরিদর্শন এবং উপদেষ্টার বক্তব্যের পর, সরকার জাদুঘরের উদ্বোধনের নির্দিষ্ট তারিখ ও আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে অঙ্গীকার করেছে। জাদুঘরের সম্পূর্ণতা ও প্রকাশনা দেশের রাজনৈতিক আলোচনার একটি নতুন মঞ্চ তৈরি করবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, যদিও সরকার এখনও আনুষ্ঠানিক সূচি প্রকাশ করেনি।
ড. ইউনূসের এই সফর এবং তার উক্তিগুলো দেশের ইতিহাসকে পুনর্বিবেচনা করার পাশাপাশি বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে জাতীয় ঐক্যের গুরুত্বকে পুনরায় জোরদার করেছে। জাদুঘরের কার্যকরী ব্যবহার এবং শিক্ষামূলক প্রোগ্রামগুলো কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা আগামী সপ্তাহে সরকারী ঘোষণার মাধ্যমে স্পষ্ট হবে।



