পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম এবং ইউনেস্কো বাংলাদেশ অফিসের প্রতিনিধিদল মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) পুলিশ সদর দপ্তরে একত্রিত হন। দু’পক্ষের আলোচনার মূল বিষয় ছিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং গুজব‑প্রতিরোধে সংস্থার ভূমিকা। বৈঠকের লক্ষ্য ছিল নির্বাচন‑সামনে গণমাধ্যম ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি করা।
ইউনেস্কো প্রতিনিধিদলে দেশীয় অফিসের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. সুসান ভাইজের নেতৃত্বে তিনজন সদস্য ছিলেন। তারা ইউনেস্কোর গ্লোবাল মিডিয়া ইনিশিয়েটিভের আওতায় গুজব‑বিরোধী কৌশল ও তথ্য‑যাচাই প্রশিক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরেন। বৈঠকে উভয় পক্ষই সাংবাদিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেন।
আলোচনার সময় প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য আইনগত কাঠামো ও নৈতিক মানদণ্ডের উন্নয়ন নিয়ে মতবিনিময় হয়। ইউনেস্কো প্রতিনিধিরা গুজব‑প্রসারণের ঝুঁকি কমাতে দ্রুত তথ্য‑যাচাই (ফ্যাক্ট‑চেকিং) প্রশিক্ষণকে মূল কৌশল হিসেবে প্রস্তাব করেন। তারা উল্লেখ করেন, এমন প্রশিক্ষণ সাংবাদিকদের সঠিক তথ্য সরবরাহে সক্ষম করবে এবং জনমতকে বিকৃত করা গুজবের প্রভাব হ্রাস করবে।
ইউনেস্কোর প্রস্তাবের প্রতিক্রিয়ায় আইজিপি বাহারুল আলম প্রশিক্ষণকে গৃহীত করে জানান, নির্বাচনী সময়ে তথ্য‑যাচাই দক্ষতা বাড়ানো জনস্বার্থ রক্ষায় সহায়ক হবে। তিনি উল্লেখ করেন, গুজব‑বিরোধী প্রশিক্ষণ সাংবাদিক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার জন্য একসাথে আয়োজন করা হবে এবং এর মাধ্যমে ভুল তথ্যের বিস্তার রোধ করা সম্ভব হবে।
বাহারুল আলম নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে প্রথমবারের মতো প্রায় দেড় লাখ পুলিশ সদস্যকে নির্বাচনী প্রশিক্ষণ প্রদান করছেন বলে জানান। এই প্রশিক্ষণ চলতি মাসের শেষের মধ্যে সম্পন্ন হবে এবং এতে ভোটদান প্রক্রিয়া, নিরাপদ ভোটদান পরিবেশ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তিনি উল্লেখ করেন, প্রশিক্ষণ শেষে পুলিশ সদস্যরা নির্বাচনী সময়ে সম্ভাব্য অশান্তি ও হিংসা মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকবে।
প্রশিক্ষণসূচিতে বিশেষ করে ভোট কেন্দ্রের নিরাপত্তা, ভোটার সুরক্ষা এবং নির্বাচনী ফলাফল সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় কৌশলগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। আইজিপি জানান, এই উদ্যোগের মাধ্যমে ভোটারদের স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা হবে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি জনবিশ্বাস বাড়বে।
বৈঠকে ইউনেস্কো সদর দপ্তরের টিম লিডার মেহেদি বেঞ্চেলাহ এবং পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের অতিরিক্ত আইজি মো. গোলাম রসুলসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তি স্থাপন করে ভবিষ্যতে তথ্য‑যাচাই কর্মশালা, সেমিনার এবং যৌথ প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালু করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেন।
বৈঠকের পর সন্ধ্যায় পুলিশ সদর দপ্তরের মাধ্যমে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়, যেখানে বৈঠকের মূল বিষয়বস্তু, গৃহীত সিদ্ধান্ত এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা সংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ইউনেস্কো ও পুলিশ উভয়ই গুজব‑বিরোধী পদক্ষেপকে জাতীয় নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করছে।
এই বৈঠক নির্বাচন‑সামনের রাজনৈতিক পরিবেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। গুজব‑প্রতিরোধ এবং সাংবাদিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে ভোটারদের তথ্য‑সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে এবং নির্বাচনী ফলাফলের প্রতি আস্থা শক্তিশালী হবে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, তথ্য‑যাচাই প্রশিক্ষণ এবং পারস্পরিক আস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগগুলো নির্বাচন‑সাময়ে সম্ভাব্য উত্তেজনা কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে এর বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণ যথাযথভাবে করা না হলে গুজবের পুনরাবৃত্তি রোধে চ্যালেঞ্জ রয়ে যাবে।
আইজিপি এবং ইউনেস্কোর এই সমন্বিত প্রচেষ্টা ভবিষ্যতে অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে তথ্য‑নির্ভর সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। নির্বাচনী সময়ে তথ্য‑বৈধতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রগতির জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
বৈঠকের পরবর্তী ধাপ হিসেবে উভয় পক্ষই নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে তথ্য‑যাচাই কর্মশালার সূচি প্রকাশের পরিকল্পনা করেছে। প্রশিক্ষণ শেষে ফলাফল মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বিতভাবে গুজব‑বিরোধী নীতি প্রয়োগ করা হবে।
সামগ্রিকভাবে, আইজিপি ও ইউনেস্কোর এই বৈঠক নির্বাচন‑সামনের নিরাপদ ও স্বচ্ছ পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যা গণমাধ্যম ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহযোগিতা বাড়াবে।



