বিশ্বের শীর্ষ অর্থনৈতিক সমাবেশ ড্যাভোস, সুইজারল্যান্ডে মঙ্গলবার চীনের উপপ্রধানমন্ত্রী হে লিফেং জঙ্গলের শাসনের দিকে ফিরে যাওয়া অবৈধ বলে সতর্ক করেন। তিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ডে সামরিক বিমান পাঠানোর পরিকল্পনা ও ভেনেজুয়েলা প্রেসিডেন্টের অপহরণসহ অন্যান্য জটিলতা উল্লেখ করে বললেন, কোনো দেশই নিজের স্বার্থে বিশেষ সুবিধা পেতে পারে না। হে লিফেংের বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল শক্তিশালী দেশগুলো দুর্বলদের শোষণ না করে আইনের শাসন বজায় রাখার আহ্বান।
ড্যাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) অধিবেশনে হে লিফেং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, গ্রিনল্যান্ডের ওপর আক্রমণাত্মক নীতি আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা নষ্ট করতে পারে। তিনি যুক্তি দেন, যদি শক্তিশালী দেশগুলো স্বার্থপরভাবে নির্দিষ্ট অঞ্চল দখল করে, তবে তা বিশ্বকে ‘জঙ্গলের শাসন’ নামে পরিচিত অস্থির অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে পারে, যেখানে শাসকরা দুর্বলদের শিকার করে।
মিডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি বিশ্বজুড়ে আক্রমণাত্মক পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা বজায় রাখছে। ন্যাটো জোটের মিত্র দেশ ডেনমার্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড হস্তান্তরের দাবি তীব্রতর করেছে। এই প্রেক্ষাপটে হে লিফেং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আইনের শাসনকে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করার জন্য আহ্বান জানান, যাতে কোনো দেশই স্বেচ্ছায় অন্যের ভূখণ্ডে হস্তক্ষেপ করতে না পারে।
হে লিফেংের মন্তব্যের পেছনে চীনের দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক কৌশলও রয়েছে। চীন বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা, বহুপাক্ষিকতা এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার পুনর্গঠনকে সমর্থন করে আসছে। ড্যাভোসে তার বক্তব্যে তিনি জোর দিয়ে বলেন, বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা যদি ‘জঙ্গলের শাসন’ মডেলে ফিরে যায়, তবে তা কেবলমাত্র শক্তিশালী দেশগুলোর জন্যই লাভজনক হবে, আর অধিকাংশ দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিশ্লেষকরা হে লিফেংের সতর্কতাকে চীনের আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রভাব বাড়ানোর একটি কৌশল হিসেবে দেখছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এবং ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক অস্থিরতা চীনের জন্য সুযোগ তৈরি করেছে, যাতে সে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় নিজের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে। হে লিফেংের বক্তব্যের মাধ্যমে চীন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একত্রিত করে, যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা পদক্ষেপের বিরোধিতা করতে চায়।
ভবিষ্যতে এই সতর্কতা কীভাবে কাজ করবে তা এখনও অনিশ্চিত। যদি যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে দেয়, তবে চীন ও অন্যান্য বড় শক্তি সম্ভবত সমন্বিতভাবে আইনের শাসন ও বহুপাক্ষিকতা বজায় রাখার জন্য কূটনৈতিক চাপ বাড়াবে। অন্যদিকে, ডেনমার্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার ফলাফলও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। হে লিফেংের মন্তব্যের পরবর্তী ধাপ হতে পারে চীনের আরও দৃঢ় কূটনৈতিক উদ্যোগ, যা আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বৈশ্বিক শীর্ষ সম্মেলনে ‘আইনের শাসন’কে মূল নীতি হিসেবে তুলে ধরবে।
সারসংক্ষেপে, ড্যাভোসে হে লিফেংের বক্তব্য বিশ্বকে ‘জঙ্গলের শাসন’ থেকে দূরে রাখার আহ্বান, যেখানে শক্তিশালী দেশগুলো দুর্বলদের শোষণ করে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ ও স্বার্থপর নীতিগুলোর বিরুদ্ধে সতর্কতা জারি করে, আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা ও আইনের শাসনের গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এই সতর্কতা ভবিষ্যতে বৈশ্বিক রাজনৈতিক গতিবিধিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করবে।



