ঢাকা, ২০ জানুয়ারি – জাতিসংঘের মনুসকো (MONUSCO) মিশনে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক কঙ্গোতে কাজ করা বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর (বিএফ) কন্টিনজেন্টের সদস্যদের উদ্দেশ্যে বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান এক বিশেষ ব্রিফিং পরিচালনা করেন। এই সেশনটি বাফ সদর দপ্তরের সেনানিবাসে অনুষ্ঠিত হয় এবং কন্টিনজেন্টের নতুন রোস্টার, BANATU‑15, এর জন্য দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
বিএফ বর্তমানে MONUSCO মিশনে BANATU‑14 ইউনিটের মাধ্যমে মোট ৬২ জন কন্টিনজেন্ট সদস্যকে প্রতিস্থাপন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। নতুন ইউনিট BANATU‑15 এর নেতৃত্বে আছেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ সেলিম জাভেদ, যিনি কঙ্গোতে চলমান অপারেশনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার দায়িত্বে আছেন।
ব্রিফিংয়ে প্রধান বিমান বাহিনীর কর্মকর্তারা শৃঙ্খলা, সততা, পেশাদারিত্ব এবং আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করার গুরুত্বের ওপর জোর দেন। তিনি উল্লেখ করেন, এই গুণাবলী কেবল বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সম্মানিত করে না, বরং মিশনের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। অনুষ্ঠানের শেষে তিনি একটি বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন, যেখানে উপস্থিত সকল কর্মকর্তা ও কর্মীকে নিরাপদ ও সফল মিশনের শুভেচ্ছা জানানো হয়।
ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন বিমান বাহিনীর প্রধান স্টাফ অফিসারগণ, ঢাকাস্থ এয়ার অধিনায়কগণ এবং বিমান সদর ও ঘাঁটির উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ। তাদের উপস্থিতি মিশনের কৌশলগত গুরুত্ব এবং দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের সমর্থনকে প্রতিফলিত করে।
বিএফের কঙ্গো মিশনে বর্তমানে একটি সি‑130বি পরিবহন বিমান এবং বিভিন্ন গ্রাউন্ড সাপোর্ট সরঞ্জাম মোতায়েন রয়েছে। এই এয়ারক্রাফ্টটি মানবিক সহায়তা, সরবরাহ এবং কর্মী পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সি‑130বির উপস্থিতি কঙ্গোর বিশাল ভূখণ্ডে দ্রুত ও কার্যকরী লজিস্টিক সমর্থন নিশ্চিত করে, যা শান্তি রক্ষার কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করে।
পরিবহন সূচি অনুযায়ী, ২৫ জানুয়ারি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৩৫ জন কন্টিনজেন্ট সদস্য কঙ্গোতে রওনা হবে। অবশিষ্ট ২৭ জন সদস্যের রওনা তারিখ নির্ধারিত হয়েছে ২ ফেব্রুয়ারি। উভয় গোষ্ঠীর সদস্যরা একাধিক প্রশিক্ষণ সেশন এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করে, যাতে তারা মিশনের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হয়।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের শান্তি রক্ষার অবদান দীর্ঘদিনের গর্বের বিষয়। বিশ্লেষক রেজিনা হোসেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ, মন্তব্য করেন, “কঙ্গোতে বিএফের উপস্থিতি শুধু মানবিক সহায়তা নয়, বরং আফ্রিকান মহাদেশে নিরাপত্তা কাঠামোকে শক্তিশালী করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। বাংলাদেশ তার বহুমুখী কূটনৈতিক নীতি এবং শান্তি রক্ষার ঐতিহ্যকে কাজে লাগিয়ে এই মিশনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।”
কঙ্গোতে চলমান সংঘাত এবং মানবিক সংকটের প্রেক্ষাপটে MONUSCO মিশনের কাজের পরিধি বিস্তৃত। বিএফের এয়ার ট্রান্সপোর্ট ইউনিটের লজিস্টিক সহায়তা, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট এবং জরুরি রেসকিউ অপারেশন মিশনের কার্যকারিতা বাড়িয়ে তুলছে। বিশেষ করে সি‑130বির সক্ষমতা দূরবর্তী এলাকায় দ্রুত সরবরাহ পৌঁছাতে সক্ষম, যা স্থানীয় জনগণের জীবনের মান উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক মন্ত্রকও এই মিশনকে দেশের আন্তর্জাতিক সুনাম বাড়ানোর একটি সুযোগ হিসেবে দেখছে। কঙ্গোতে চলমান শান্তি রক্ষার কার্যক্রমে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ, আফ্রিকান ইউনিয়ন এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়কে শক্তিশালী করে। এই প্রেক্ষাপটে, কঙ্গো সরকারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা চুক্তি এবং লজিস্টিক সমর্থনের ব্যবস্থা আরও সুদৃঢ় হয়েছে।
মিশনের পরবর্তী মাইলস্টোন হিসেবে, কন্টিনজেন্টের প্রথম রোস্টার ডেপ্লয়মেন্টের পর ৩ মাসের মধ্যে কার্যক্রমের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হবে। মূল্যায়নের ভিত্তিতে অতিরিক্ত সরঞ্জাম বা কর্মী প্রয়োজন হলে তা দ্রুত সমন্বয় করা হবে। এছাড়া, কঙ্গোতে চলমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং মানবিক চাহিদার পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মিশনের কৌশলগত পরিকল্পনা আপডেট করা হবে।
বিএফের এই উদ্যোগ কেবল আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষার মিশনে দেশের অবদানকে পুনর্ব্যক্ত করে না, বরং দেশের সামরিক ও কূটনৈতিক নীতির সমন্বয়কে দৃঢ় করে। কঙ্গোতে চলমান মিশনের সফলতা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা এবং ভবিষ্যতে সম্ভাব্য নতুন মিশনের জন্য ভিত্তি স্থাপন করবে।



