শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে সিরাজগঞ্জের তাড়াশে খেজুরের রস সংগ্রহের মৌসুম শুরু হয়েছে, যা থেকে উচ্চমানের খেজুরের গুড় উৎপাদন করা হচ্ছে। স্থানীয় কৃষক ও কারিগররা গাছের মালিকদের সঙ্গে লিজ চুক্তি করে শত শত খেজুর গাছের রস সংগ্রহের কাজ চালু করে। রস সংগ্রহের সময় গাছের শিকড়ের চারপাশে কলস স্থাপন করে ভোরবেলা থেকে রস আহরণ করা হয়, এরপর তা জালিয়ে শুদ্ধ করা হয় এবং গুড়ের রূপে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত গুড়ের স্বাদ ও গুণমানের কারণে স্থানীয় বাজারে উচ্চ চাহিদা দেখা যাচ্ছে।
তাড়াশের প্রধান রাস্তা ও পুকুরের পার্শ্ববর্তী এলাকায় প্রায় দুইশতাধিক খেজুর গাছ রয়েছে, যেগুলো শীতের আগে লিজে নেওয়া হয়। গাছের মালিকদের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের পর, গাছের পরিচর্যা ও রস সংগ্রহের প্রস্তুতি শীতের শুরুতে ত্বরান্বিত হয়। রস সংগ্রহের জন্য ব্যবহৃত কলসের মাথা বিশেষভাবে ঢেকে রাখা হয় যাতে বাতাসের দূষণ না হয় এবং রসের স্বাদ বজায় থাকে। সংগ্রহিত রস জালিয়ে পরিষ্কার করার পর, তা গরম করে ঘন করে গুড়ের আকারে গড়া হয়, কিছু ক্ষেত্রে দানাদার রূপে কলসের ভিতরে সংরক্ষণ করা হয়।
গুড়ের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় রসকে বিভিন্ন আকারে গঠন করা হয়, যাতে তা বাজারে বিভিন্ন প্যাকেজে বিক্রি করা যায়। তাড়াশের কারিগররা রসকে জালিয়ে ঘন করার পর, তা কেজি ভিত্তিতে দেড়শ থেকে তিনশ টাকার মধ্যে বিক্রি করা হয়। এই মূল্য সীমা স্থানীয় গ্রাহকদের পাশাপাশি জেলায় ও পার্শ্ববর্তী জেলায় পাইকারদের কাছেও গ্রহণযোগ্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। দাম তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী হওয়ায়, গুড়ের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে এবং বিক্রয় পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মোক্তার হোসেনের মতে, গুড় ও রস দিয়ে তৈরি পায়েস, পিঠা এবং অন্যান্য মিষ্টি খাবার শীতকালে বিশেষ জনপ্রিয়। ভোরে গ্লাসে ভরা তাজা রস বিক্রি হয়, যা মুড়ি বা অন্যান্য স্ন্যাকের সঙ্গে খাওয়া হলে স্বাদে অতিরিক্ত মিষ্টি যোগ করে। এই ধরনের ভোক্তা অভ্যাসের ফলে রসের বিক্রয়ও দিন-রাত বাড়ছে, যা স্থানীয় ব্যবসায়িক চক্রকে শক্তিশালী করছে। তাছাড়া, গুড়ের গুণমান ও স্বাদকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রেস্টুরেন্ট ও হোমমেড মিষ্টি প্রস্তুতকারকদের মধ্যে নতুন বাজার গড়ে উঠছে।
উপজেলা কৃষি অফিসার শর্মিষ্ঠা সেন গুপ্তা জানান, গাছের রস ও গুড়ের নিরাপদ উৎপাদনের জন্য কৃষি বিভাগ নিয়মিত পরামর্শ প্রদান করে। রস সংগ্রহের সময় কলসের মাথা ঢেকে রাখা, এবং গুড় তৈরির সময় কোনো কৃত্রিম চিনি বা ক্ষতিকারক রাসায়নিক ব্যবহার না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এসব নির্দেশনা মানলে পণ্যটির গুণমান বজায় থাকে এবং ভোক্তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকে। এছাড়া, জেলায় আরও খেজুর গাছ রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে, যা ভবিষ্যতে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে।
বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তাড়াশের খেজুরের রস ও গুড়ের উৎপাদন স্থানীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। গাছের লিজ, রস সংগ্রহ, জালানো, প্যাকেজিং এবং বিক্রয় পর্যন্ত পুরো চেইনে প্রায় একশতাধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। উৎপাদিত পণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকায়, কৃষক ও ব্যবসায়ীরা লাভজনক ব্যবসা চালাতে পারছে। তদুপরি, গুড়ের গুণমানের কারণে পার্শ্ববর্তী জেলা ও বৃহত্তর বাজারে রপ্তানি সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে, যা আঞ্চলিক বাণিজ্যকে উত্সাহিত করবে।
তবে, মৌসুমী প্রকৃতির কারণে উৎপাদন পরিমাণে পরিবর্তনশীলতা রয়ে যায়। শীতের তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের অবস্থা রসের প্রবাহে সরাসরি প্রভাব ফেলে, যা সরবরাহের ধারাবাহিকতাকে চ্যালেঞ্জিং করে তুলতে পারে। এছাড়া, লিজের ওপর নির্ভরতা এবং গাছের স্বাস্থ্য রক্ষণাবেক্ষণেও অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হতে পারে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য কৃষি বিভাগ থেকে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিকোণ থেকে, তাড়াশে খেজুর গাছের সংখ্যা বাড়িয়ে রস ও গুড়ের উৎপাদন স্কেল আপ করা সম্ভব। সরকারী সহায়তায় নতুন চারা রোপণ, আধুনিক রস সংগ্রহের যন্ত্রপাতি এবং গুণমান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে, পণ্যের বাজারমূল্য আরও উন্নত হবে। একই সঙ্গে, প্যাকেজিং ও ব্র্যান্ডিংয়ে উন্নতি করলে বৃহত্তর ভোক্তা গোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো সহজ হবে। এই ধরনের কাঠামোগত উন্নয়ন স্থানীয় কৃষকদের আয় বাড়াবে এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করবে।
সংক্ষেপে, সিরাজগঞ্জের তাড়াশে শীতকালে খেজুরের রস ও গুড়ের উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার ফলে স্থানীয় বাজারে সরবরাহের পরিমাণ ও মূল্য স্থিতিশীল রয়েছে। উৎপাদন প্রক্রিয়ার নিরাপত্তা ও গুণমান বজায় রাখতে সরকারি নির্দেশনা কার্যকর হচ্ছে, এবং ভবিষ্যতে গাছ রোপণ ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এই প্রবণতা স্থানীয় কর্মসংস্থান, আয় এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, তবে মৌসুমী ঝুঁকি ও লিজের ওপর নির্ভরতা মোকাবিলায় অতিরিক্ত সমর্থন প্রয়োজন।



