চট্টগ্রাম বিভাগের সীতাকুণ্ড জেলায় অবস্থিত জঙ্গল সলিমপুরে র্যাব (রিপাবলিক অ্যাকশন ব্যুরো) সদস্যদের ওপর গত সোমবার সন্ধ্যায় মাইকে ঘোষণার সময় বিশাল সংখ্যক আক্রমণকারী হস্তক্ষেপ করে। র্যাবের মতে, হামলায় প্রায় চারশত থেকে পাঁচশতজন পর্যন্ত অংশগ্রহণকারী ছিল। আক্রমণের ফলে র্যাবের কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত এবং অন্তত তিনজন সহকর্মী আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
সকালবেলা জঙ্গল সলিমপুরে র্যাবের দুইটি মাইক্রোবাস (হাইয়েস) পৌঁছানোর পর, কিছু ব্যক্তি লাঠি নিয়ে গাড়িগুলোর দিকে ছুটে আসে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, আক্রমণকারীরা গাড়ির কাচ ভেঙে ফেলেছে এবং গাড়িগুলোকে ধাক্কা দিয়ে থামিয়ে দেয়। একই সময়ে, এলাকায় মাইকে ঘোষণার শব্দ শোনা যায়, যেখানে এক ব্যক্তি ফটক (অবৈধ বসতি) আটকানোর আহ্বান জানায়।
জঙ্গল সলিমপুরের ভূগোলিক অবস্থান চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামি থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে, এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটির বিপরীতে লিংক রোডের উত্তরে, প্রায় তিন হাজার একশ একর জমিতে বিস্তৃত। যদিও সীতাকুণ্ডের অধীনে থাকে, তবে শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত বলে এটিকে নগরাঞ্চলীয় বলে ধরা হয়। উত্তরে হাটহাজারী উপজেলা, দক্ষিণে বায়েজিদ থানা এই এলাকার সীমানা নির্ধারণ করে।
দশক ধরে পাহাড় কেটে অবৈধ বসতি গড়ে ওঠার ফলে জঙ্গল সলিমপুরে কয়েক হাজার মানুষ বসতি স্থাপন করেছে। এই বসতিগুলোকে রক্ষা করতে এবং দখল বজায় রাখতে সশস্ত্র গোষ্ঠী গঠন করা হয়েছে, যাদেরকে প্রায়শই ভূমিদস্যু বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বলা হয়। এই গোষ্ঠীগুলো এলাকায় সার্বক্ষণিক অস্ত্রধারী পাহারা বজায় রাখে, যা নিরাপত্তা সংস্থার কার্যক্রমকে কঠিন করে তুলেছে।
র্যাবের সহকারী পরিচালক (গণমাধ্যম) এ আর এম মোজাফফর হোসেন জানিয়েছেন, আহত তিনজন র্যাব সদস্য বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, হামলার প্রকৃত কারণ এবং দায়ী ব্যক্তিদের সনাক্তকরণের জন্য তদন্ত চলমান। তদন্তে সংশ্লিষ্ট সকল তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সিসিটিভি রেকর্ড ও সাক্ষী বিবরণী বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে গত বছরের ৫ আগস্টের পরে, বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে দখল-নিয়ন্ত্রণের জন্য গুলিবর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ধারাবাহিকভাবে ঘটছে। এই সময়ে দু’জন সাংবাদিককে সশস্ত্র গোষ্ঠীর আক্রমণে আহত করা হয়েছে, যা মিডিয়া কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।
হামলার সময় র্যাবের মাইক্রোবাসগুলোকে লাঠি ও পাথর দিয়ে আক্রমণ করা হয়, ফলে গাড়ির কাচ ভেঙে যায় এবং চালক ও যাত্রীদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। সিসিটিভি ফুটেজে আক্রমণকারীরা গাড়ির পিছনের অংশে লাঠি দিয়ে আঘাত করে, যা গাড়ির গতি ধীর করে এবং র্যাব সদস্যদের থামিয়ে দেয়। এই ধরনের হিংসাত্মক আচরণ র্যাবের কর্মীদের কাজের পরিবেশকে বিপন্ন করে তুলেছে।
র্যাবের মতে, আক্রমণে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা মাইকে ঘোষণার মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি ও উদ্দেশ্য প্রকাশ করছিল। ঘোষণায় ফটক (অবৈধ বসতি) আটকানোর আহ্বান জানানো হয়, যা স্থানীয় গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যায়। তবে, এই ঘোষণার সঙ্গে হিংসা যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি দ্রুত উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অধিকাংশ বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, জঙ্গল সলিমপুরের ভূখণ্ডীয় বৈশিষ্ট্য এবং অবৈধ বসতির বিস্তারই এই ধরনের সশস্ত্র সংঘাতের মূল কারণ। পাহাড় কাটা, জমি দখল এবং অবৈধ নির্মাণের ফলে স্থানীয় জনগণের মধ্যে সম্পদ ও ভূমি নিয়ে বিরোধ বাড়ছে। এই পরিস্থিতি সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান এবং র্যাবের মতো নিরাপত্তা সংস্থার ওপর আক্রমণের দিকে নিয়ে যায়।
স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসন এই ঘটনার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করেছে। সিসিটিভি রেকর্ড, গ্যাংস্টারদের পরিচয় এবং আক্রমণের সময়ের অডিও রেকর্ড সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এছাড়া, আহত র্যাব সদস্যদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং মৃতের পরিবারকে সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
র্যাবের সহকারী পরিচালক মোজাফফর হোসেনের মতে, তদন্তের ফলাফল প্রকাশের পর দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি উল্লেখ করেন, র্যাবের সকল সদস্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে পদক্ষেপ নেয়া হবে।
এই ঘটনার পর, চট্টগ্রাম বিভাগের নিরাপত্তা সংস্থাগুলি জঙ্গল সলিমপুরে সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা করছে। স্থানীয় প্রশাসনও অবৈধ বসতি ও ভূমি দখল সমস্যার সমাধানে দীর্ঘমেয়াদী নীতি প্রণয়নের কথা প্রকাশ করেছে। তবে, বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পুনরায় হিংসা রোধ করা অগ্রাধিকার হিসেবে রয়ে গেছে।



