যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কীর্স স্টার্মার ডাউনিং স্ট্রিটে এক বক্তৃতায় জানিয়েছেন, ট্রাম্পের ১০ শতাংশ শুল্ক হুমকি এবং গ্রিনল্যান্ডের ওপর তার নিয়ন্ত্রণের ইচ্ছা নিয়ে বাণিজ্যিক সংঘর্ষ কোনো পক্ষেরই লাভের নয়। তিনি উল্লেখ করেছেন, এই পরিস্থিতি দেশের সমগ্র নাগরিককে একত্রিত হয়ে মোকাবেলা করা প্রয়োজন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসনকে চ্যালেঞ্জ করে এমন দেশগুলোকে যুক্তরাজ্যসহ ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপের ইঙ্গিত দিয়েছেন। এই হুমকি গ্রিনল্যান্ডের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এবং যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ও উত্তর আমেরিকান বাণিজ্যিক সম্পর্ককে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে।
স্টার্মার তার বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেছেন, বাণিজ্যিক বিরোধ সমাধানের সঠিক পদ্ধতি হল শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক সমঝোতা গড়ে তোলা, না যে শুল্কের মাধ্যমে শত্রুতা বাড়ানো। তিনি যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক সঙ্গতি, বিশেষ করে অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে, বজায় রাখার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন।
গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্টার্মার স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, দ্বীপের স্বায়ত্তশাসন ও তার জনগণের ইচ্ছা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। তিনি ডেনমার্কের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি এবং গ্রিনল্যান্ডের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারকে অগ্রাহ্য করা যাবে না বলে জোর দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলছেন, আন্তর্জাতিক নীতি ও নৈতিক নীতিমালা অমান্য করা যায় না, তবে বাস্তবিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে একটি ব্যবহারিক পন্থা গ্রহণ করা দরকার। তিনি যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক বাণিজ্যিক ও সামরিক সহযোগিতার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করে, উভয় দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য সমন্বিত কৌশল প্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করেছেন।
ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ডের ওপর সামরিক হুমকি সম্পর্কে স্টার্মার জানান, তিনি বিশ্বাস করেন না যে প্রেসিডেন্ট সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। তবে তিনি এই বিষয়কে “খুবই গম্ভীর” বলে উল্লেখ করে, দেশের অভ্যন্তরে সংহতি ও সতর্কতা বজায় রাখার আহ্বান জানান।
স্টার্মার দেশের নাগরিকদেরকে একত্রিত হয়ে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার আহ্বান জানিয়ে, “এটি পুরো জাতির জন্য একত্রে কাজ করার মুহূর্ত” বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কর্মসংস্থান রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সম্পর্কের গুরুত্ব পুনরায় তুলে ধরেছেন।
কনজারভেটিভ নেতা কেমি বেডেনচের সমর্থনকে স্টার্মার স্বাগত জানিয়ে, গ্রিনল্যান্ড সংক্রান্ত সম্ভাব্য শুল্ক বিষয়ক আলোচনা ও সমঝোতায় সহযোগিতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বেডেনচের এই সমর্থনকে দেশের অভ্যন্তরে ঐক্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি যুক্তরাজ্যে “খুবই খারাপভাবে গ্রহণ করা হয়েছে” বলে স্টার্মার মন্তব্য করেন এবং এমন পদক্ষেপকে “প্রদর্শনমূলক” বা “দৃশ্যমান” বলে সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, এই ধরনের কাজ রাজনীতিবিদদের স্বল্পমেয়াদী জনপ্রিয়তা বাড়াতে পারে, তবে সাধারণ কর্মচারী ও তাদের জীবিকার ওপর কোনো বাস্তবিক উপকার করে না।
প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষে যুক্তি দেন, কারণ এই সম্পর্কের ফলে যুক্তরাজ্যে “শত শত বিলিয়ন পাউন্ড” বিনিয়োগ এসেছে। তিনি উল্লেখ করেন, এই অর্থনৈতিক প্রবাহ দেশের অবকাঠামো, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বক্তৃতার সময় স্টার্মার যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা, পারমাণবিক ক্ষমতা ও গোয়েন্দা সহযোগিতার ওপরও জোর দিয়েছেন। তিনি বলছেন, এই ক্ষেত্রগুলোতে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সমন্বয়ই দুই দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মূল ভিত্তি।
যদি যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক আরোপের পথে অগ্রসর হয়, তবে স্টার্মার জানান, “এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছাইনি” এবং তার প্রধান লক্ষ্য হল এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলা। তিনি পুনরায় জোর দিয়ে বলেছেন, উভয় দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য শুল্কবিহীন সমঝোতা বজায় রাখা জরুরি।
বক্তৃতার পর স্টার্মার কানাডা ও ইতালির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ও জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। তিনি যুক্তরাজ্যের বর্তমান বাণিজ্যিক কৌশল ও গ্রিনল্যান্ড সংক্রান্ত অবস্থান সম্পর্কে তাদেরকে বিস্তারিতভাবে জানিয়ে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
স্টার্মার শেষ করে উল্লেখ করেন, ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্য শুল্কবিরোধী নীতি বজায় রেখে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে শান্তিপূর্ণ সমঝোতা ও পারস্পরিক লাভের ভিত্তিতে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে।



