জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) করদাতাদের কাছ থেকে ২০২৩ সালের আইটি‑১১জি রিটার্নে জীবনের বিভিন্ন দিকের খরচের বিশদ বিবরণ চায়। এই নির্দেশনা অনুসারে, প্রত্যেক ট্যাক্সদাতা তার বার্ষিক আয়কর ফরমে নয়টি নির্দিষ্ট ব্যয়ের বিভাগ আলাদা করে উল্লেখ করতে হবে, যাতে সরকারী রেকর্ডে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ব্যয়ের প্রকৃত মাত্রা ধরা যায়।
এনবিআরের এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হল করদাতার আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্য যাচাই করা এবং করের ন্যায্যতা নিশ্চিত করা। রিটার্নে উল্লেখিত তথ্যের ভিত্তিতে, কর অফিসাররা নির্ধারণ করতে পারবেন যে করদাতা তার আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে জীবনযাপন করছেন কিনা, এবং কোনো অতিরিক্ত সুবিধা বা অব্যবহৃত আয় আছে কি না।
প্রথম বিভাগে পরিবারিক ব্যয়কে কেন্দ্র করে বিবরণী চাওয়া হয়েছে। এতে খাবার, গৃহস্থালী সামগ্রী, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য দৈনন্দিন প্রয়োজনীয়তা অন্তর্ভুক্ত। করদাতা তার পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণে যে মোট খরচ করেছে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করবেন।
দ্বিতীয় বিভাগে বাসা বা ফ্ল্যাটের ভাড়া ও রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত খরচের তথ্য দরকার। বাড়ি ভাড়া নেওয়া হলে মাসিক ভাড়া, নিরাপত্তা, পরিষ্কার‑পরিচ্ছন্নতা এবং রক্ষণাবেক্ষণের খরচ আলাদা করে দেখাতে হবে। নিজের সম্পত্তি থাকলেও, মেরামত, রঙ করা, গৃহস্থালী যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদির ব্যয় এখানে অন্তর্ভুক্ত হবে।
গাড়ি সম্পর্কিত ব্যয় তৃতীয় বিভাগে অন্তর্ভুক্ত। গাড়ি মালিক হলে জ্বালানি, ট্যাক্স, বীমা, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচের পাশাপাশি ড্রাইভার রাখলে তার বেতন‑ভাতা ও ভাতা‑খরচও এখানে উল্লেখ করতে হবে। এই তথ্যের মাধ্যমে করদাতার আয় গাড়ি চালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে কতটা ব্যবহার হচ্ছে তা নির্ণয় করা সম্ভব।
চতুর্থ বিভাগে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, টেলিফোন, মোবাইল ও ইন্টারনেটের মাসিক বিলের বিবরণ চাওয়া হয়েছে। এই ইউটিলিটি ব্যয়গুলোকে আলাদা করে দেখালে করদাতা কতটা আধুনিক সেবা ব্যবহার করছেন এবং তার আয়‑সামঞ্জস্যতা কীভাবে বজায় আছে তা স্পষ্ট হয়।
পঞ্চম বিভাগে সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় অন্তর্ভুক্ত। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত, স্কুল ফি, টিউশন, পাঠ্যপুস্তক, ইউনিফর্ম এবং অতিরিক্ত কোচিং ফি সবই এখানে তালিকাভুক্ত হবে। এই তথ্যের মাধ্যমে শিক্ষার জন্য ব্যয় করা অর্থের পরিমাণ এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থা বিশ্লেষণ করা যাবে।
ষষ্ঠ বিভাগে বিশেষভাবে টিউশন ফি উল্লেখ করা হয়েছে, যা পঞ্চম বিভাগের অংশ হলেও আলাদা করে বিবেচনা করা হয়। এখানে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পেশাগত কোর্স বা বিদেশে পড়াশোনার ফি অন্তর্ভুক্ত হবে।
সপ্তম বিভাগে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে করা সব ধরনের ব্যয় রিপোর্ট করতে হবে। ক্রেডিট কার্ডে কেনা জিনিসপত্র, সেবা, ভ্রমণ, হোটেল, রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি সবই এখানে অন্তর্ভুক্ত হবে। এই তথ্যের মাধ্যমে করদাতার ক্রেডিট ব্যবহারের প্যাটার্ন এবং সম্ভাব্য অতিরিক্ত আয় চেক করা সম্ভব।
অষ্টম বিভাগে বিদেশি ভ্রমণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যয় উল্লেখ করা হবে। ভ্রমণ টিকিট, হোটেল, ভিসা ফি, ভ্রমণ বীমা এবং অন্যান্য বিদেশি ব্যয় এখানে তালিকাভুক্ত হবে। এই তথ্যের মাধ্যমে করদাতা কতটা আন্তর্জাতিক ভ্রমণ করছেন এবং তার আয়ের সঙ্গে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা তা নির্ণয় করা যাবে।
নবম ও শেষ বিভাগে অন্যান্য জীবনের খরচের বিবরণ চাওয়া হয়েছে, যা উপরের আটটি বিভাগে না পড়ে এমন ব্যয়কে অন্তর্ভুক্ত করে। উদাহরণস্বরূপ, দান, বীমা প্রিমিয়াম, অবসর পরিকল্পনা, বা কোনো বিশেষ প্রকল্পের জন্য ব্যয় এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে।
করদাতাদের জন্য এই নতুন ফরম্যাটের অর্থনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট। প্রথমদিকে অতিরিক্ত ডকুমেন্টেশন ও হিসাব রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সময় ও শ্রমের প্রয়োজন হবে, তবে দীর্ঘমেয়াদে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং কর ফাঁকি কমবে বলে আশা করা যায়। আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ট্যাক্স পরামর্শদাতারা এই পরিবর্তনের ফলে সেবা চাহিদা বৃদ্ধি পাবে, কারণ করদাতারা সঠিকভাবে তথ্য সংগ্রহের জন্য পেশাদার সাহায্য নিতে পারেন।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে, এনবিআরের এই উদ্যোগ কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং ডিজিটাল রিটার্ন ফাইলিংয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তথ্যের বিশদতা বাড়লে কর সংগ্রহের দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে, যা বাজেট ঘাটতি কমাতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে, করদাতাদের আয়‑ব্যয়ের স্বচ্ছতা বাড়লে আর্থিক পরিকল্পনা ও ঋণপ্রাপ্তিতে সুবিধা পেতে পারেন।
ভবিষ্যতে এনবিআরের এই ধরণের বিশদ ব্যয় রিপোর্টের প্রয়োজনীয়তা বাড়তে পারে, বিশেষত যখন সরকার ডিজিটাল অর্থনীতি ও সেবা-ভিত্তিক করের কাঠামো গড়ে তুলবে। করদাতাদের জন্য এখনই যথাযথ রেকর্ড রাখা এবং ব্যয়ের শ্রেণীবিভাগে মনোযোগ দেওয়া জরুরি, যাতে রিটার্ন দাখিলের সময় কোনো অসুবিধা না হয়।
সারসংক্ষেপে, এনবিআরের নতুন নির্দেশনা করদাতার জীবনযাপনের সব দিকের ব্যয়কে নথিভুক্ত করার দাবি করে, যা স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা এবং আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গৃহীত। করদাতাদের উচিত সময়মতো এই চাহিদা মেনে চলা এবং প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টেশন প্রস্তুত করা, যাতে রিটার্ন ফাইলিং প্রক্রিয়া মসৃণভাবে সম্পন্ন হয়।



