বিশ্বের কর্মবাজারে চাকরি প্রার্থীর সংখ্যা সুযোগের তুলনায় অনেক বেশি, আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতি এই চাপে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তরুণ স্নাতক থেকে অভিজ্ঞ পেশাজীবী পর্যন্ত সবাই ভবিষ্যতে কোন পেশা টিকে থাকবে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (WEF) ‘Future of Jobs Report 2025’ অনুসারে, ২০২৩ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৯২ মিলিয়ন বর্তমান চাকরি অপ্রচলিত হয়ে যাবে। একই সময়ে ১৭০ মিলিয়ন নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হবে, ফলে বৈশ্বিকভাবে মোট ৭৮ মিলিয়ন চাকরির নিট বৃদ্ধি প্রত্যাশিত।
এই বিশাল পরিবর্তনের পেছনে এআই, স্বয়ংক্রিয়তা, সবুজ রূপান্তর, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং কোভিড‑১৯ পরবর্তী কাজের পদ্ধতির পরিবর্তন প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। প্রযুক্তি গ্রহণের গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিল্পখাতে উৎপাদনশীলতা ও সেবা মানের উন্নতি ঘটবে, যা নতুন ব্যবসা মডেল ও বাজারের উন্মোচন করবে।
প্রতিবেদনটি আরও জানায় যে, মূল কাজের দক্ষতার প্রায় ৪০ শতাংশ পরিবর্তনের মুখে থাকবে। কর্মী যদি নতুন দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের ক্যারিয়ার স্থবির হয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়বে। তাই প্রতিষ্ঠান ও সরকার উভয়েরই প্রশিক্ষণ ও পুনঃদক্ষতা উন্নয়নে ত্বরান্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
পরবর্তী চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা দেখা যাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং (AI/ML) বিশেষজ্ঞদের জন্য। অ্যালগরিদম ডিজাইন, ডেটা মডেলিং, সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন থেকে শুরু করে নৈতিক নীতি প্রয়োগ পর্যন্ত বিস্তৃত কাজের পরিসর থাকবে।
এআই ও এমএল ক্ষেত্রের বিশেষায়িত ভূমিকা শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত নয়; নৈতিক এআই বাস্তবায়ন, পক্ষপাত দূরীকরণ, ডেটা গোপনীয়তা রক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা পরিচালনা ইত্যাদি কাজের জন্যও বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন বাড়বে। এসব কাজের জন্য ডেটা বিজ্ঞান, নীতি বিশ্লেষণ এবং সামাজিক বিজ্ঞান সমন্বিত জ্ঞান দরকার।
বাংলাদেশে ডিজিটাল সেবা ও আইটি রপ্তানির দ্রুত বৃদ্ধি এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করছে। দেশের তরুণ প্রযুক্তি-সচেতন কর্মশক্তি এআই ভিত্তিক প্রকল্পে অংশগ্রহণের সুযোগ পেতে পারে, যা রপ্তানি আয় ও অভ্যন্তরীণ উৎপাদনশীলতা উভয়ই বাড়াবে।
ইউনেস্কোর ‘Bangladesh Artificial Intelligence Readiness Assessment Report’ অনুসারে, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে এআই গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে গবেষণার দিকটি মূলত একাডেমিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ, যেখানে শিল্পখাতে প্রয়োগের মাত্রা এখনও কম।
প্রতিবেদনটি জোর দেয় যে, এআই প্রযুক্তিকে বাস্তব ব্যবসা ও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সংযুক্ত করা হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কৃষি, স্বাস্থ্য, লজিস্টিক্স এবং আর্থিক সেবায় এআই সমাধান গ্রহণ করলে দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং নতুন সেবা মডেল উদ্ভব হবে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, এআই দক্ষতা সম্পন্ন কর্মী নিয়োগের জন্য কোম্পানিগুলি বেতন ও সুবিধা বাড়িয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে, প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম ও সার্টিফিকেশন কোর্সের চাহিদা বাড়ছে, যা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও টেক স্টার্টআপের জন্য নতুন ব্যবসা সুযোগ তৈরি করছে।
অন্যদিকে, যারা বর্তমান দক্ষতায় আটকে আছে বা পুনঃদক্ষতা অর্জনে অক্ষম, তাদের জন্য চাকরি হারানোর ঝুঁকি বাড়বে। বিশেষ করে রুটিন কাজের ওপর নির্ভরশীল সেক্টরগুলো স্বয়ংক্রিয়তার ফলে কর্মসংস্থান সংকুচিত হতে পারে। তাই নীতি নির্ধারকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ও পুনঃপ্রশিক্ষণ পরিকল্পনা গড়ে তোলা জরুরি।
সংক্ষেপে, ২০৩০ সালের দিকে বিশ্ব কর্মবাজারে ৯২ মিলিয়ন পুরনো কাজের স্থানচ্যুতি এবং ১৭০ মিলিয়ন নতুন কাজের সৃষ্টির মাধ্যমে বিশাল পরিবর্তন ঘটবে। এআই ও ডিজিটাল রূপান্তর দক্ষতার পুনর্গঠনকে বাধ্য করবে, এবং বাংলাদেশে এই প্রবণতা শিল্পের উৎপাদনশীলতা ও রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত।
ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠান ও সরকারকে সমন্বিতভাবে দক্ষতা উন্নয়ন, নৈতিক এআই ব্যবহারের মানদণ্ড এবং শিল্প-শিক্ষা সংযোগের কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এভাবেই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ঝুঁকি কমিয়ে টেকসই অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পথ প্রশস্ত করা সম্ভব।



