বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সম্প্রতি ২১০০ কোটি টাকার সমষ্টিগত বন্ড ইস্যু প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। এই প্রস্তাবগুলো ছিল এমন কিছু ব্যাংকের, যাদের পূর্বে বাংলাদেশ ব্যাংক (বিবি) থেকে কোনো আপত্তি না থাকার সনদ (এনওসি) পাওয়া ছিল।
প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের তালিকায় সাউথইস্ট ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক এবং ওয়ান ব্যাংকসহ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত। এসব ব্যাংক তাদের মূলধন পর্যাপ্ততা, লিভারেজ, তরলতা, সম্পদ গুণমান, স্ট্রেস‑টেস্ট ফলাফল, পরিশোধ ক্ষমতা এবং শাসন কাঠামো ইত্যাদি বিবেচনা করে বিবি তাদের এনওসি প্রদান করেছিল।
বিবি এনওসি প্রদান করার মূল উদ্দেশ্য হল ব্যাংকের প্রস্তাবটি প্রুডেনশিয়াল নিয়মাবলীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সিস্টেমিক ঝুঁকি সৃষ্টি না করবে তা নিশ্চিত করা। তবে এই সনদটি শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের গ্যারান্টি নয়; শেষ অনুমোদন বিএসইসির হাতে থাকে।
বিএসইসি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের কারণ হিসেবে ব্যাংকের আর্থিক পারফরম্যান্স, বিশেষ করে তরলতা ও লাভজনকতা পর্যাপ্ত না হওয়া উল্লেখ করেছে। শেয়ারবাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে, বিনিয়োগকারীর সুরক্ষা, তথ্য প্রকাশের মান, নগদ প্রবাহ এবং বন্ডধারীদের সময়মত পরিশোধের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।
একজন সিনিয়র মার্জেন্ট ব্যাংকারের মতে, বিবি থেকে প্রাপ্ত এনওসি ব্যাংকের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার সর্বোচ্চ চেকপয়েন্টের সমতুল্য। এই সনদটি মূলত নির্দেশ করে যে প্রস্তাবটি ব্যাংকের মূলধন কাঠামোকে দুর্বল করবে না এবং সামগ্রিক আর্থিক চাপ বাড়াবে না।
বিএসইসির মূল্যায়ন প্রক্রিয়া ভিন্ন; এটি মূলত মূলধন বাজারের স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগকারীর স্বার্থ রক্ষার উপর জোর দেয়। বন্ডের নগদ প্রবাহ, পরিশোধের সময়সূচি এবং প্রকাশিত তথ্যের যথার্থতা এই মূল্যায়নের মূল অংশ।
সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড, যা টিয়ার‑২ মূলধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, ব্যাংকের জন্য ইকুইটি হ্রাস না করে মূলধন শক্তিশালী করার একটি উপায়। এই ধরনের বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংক দীর্ঘমেয়াদী দায়বদ্ধতা গঠন করতে পারে, যা স্বল্পমেয়াদী আমানত উপর নির্ভরতা কমায়।
বন্ড ইস্যু করার ফলে ব্যাংক তার সম্পদ‑দায়ের মেয়াদ মিলিয়ে নিতে পারে, ফলে সম্পদ‑দায়ের গঠন আরও সুসংহত হয়। একই সঙ্গে, বাজারে অতিরিক্ত তরলতা সরবরাহের মাধ্যমে ঋণগ্রহীতাদের জন্য সুদের হার হ্রাসের সম্ভাবনা থাকে।
বর্তমানে দেশের বেশ কয়েকটি ব্যাংক নেতৃত্ব পরিবর্তন, ব্যালেন্স শিট পরিষ্কারকরণ এবং কার্যকরী পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এই সময়ে বন্ড ফাইন্যান্সিং একটি শ্বাসপ্রশ্বাসের সুযোগ প্রদান করে, যা ব্যাংকের টেকসই পুনরুদ্ধারের ভিত্তি গড়ে তুলতে সহায়ক।
বিএসইসির এই সিদ্ধান্ত বাজারে সতর্কতা সৃষ্টি করেছে; বিনিয়োগকারীরা এখন ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্যের ওপর আরও কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে, ব্যাংকগুলোকে তাদের তরলতা ও লাভজনকতা উন্নত করার জন্য অতিরিক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে।
ভবিষ্যতে, যদি ব্যাংকগুলো তাদের আর্থিক সূচকগুলোকে শক্তিশালী করে এবং শেয়ারবাজারের নিয়মাবলী মেনে চলে, তবে বন্ড ইস্যু পুনরায় অনুমোদিত হতে পারে। তবে বর্তমান পর্যায়ে, বিএসইসির কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগকারীর সুরক্ষার প্রতি গুরুত্ব আরোপের ইঙ্গিত দেয়।



