বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ৭০০ মেগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ডের নিলাম প্রক্রিয়া অচল অবস্থায় রয়েছে। এই ব্যান্ড, যা আন্তর্জাতিকভাবে “গোল্ডেন স্পেকট্রাম” নামে পরিচিত, 5G সেবা বিস্তারের পাশাপাশি গ্রামীণ ও দূরবর্তী অঞ্চলে সাশ্রয়ী উচ্চগতির ইন্টারনেট সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত। তবে নিলামের শেষ পর্যায়ে একাধিক অপারেটরের প্রত্যাহার এবং মাত্র গ্রামীণফোনের অংশগ্রহণের ফলে প্রক্রিয়া থেমে যায়।
নিলামের মোট দরপত্রের মূল্য প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা, কিন্তু তা শুধুমাত্র গ্রামীণফোনের কাছ থেকে পাওয়া গিয়েছে। অন্যান্য বড় ও ছোট টেলিকম কোম্পানি প্রত্যাহার করার পরে, নিলামের স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা এবং জনস্বার্থের সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
৪ জানুয়ারি, আইন শিক্ষানবিশ রাইসা মৃধা সামান্তা নিলামকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে রিটের আবেদন দায়ের করেন। তিনি নিলামের ফলে জনসাধারণের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। রিটের পর, ১৪ জানুয়ারি হাইকোর্টের বিচারপতি রাজিক‑আল‑জলিল ও বিচারপতি আনোয়ারুল ইসলাম নিলাম সংক্রান্ত রুল জারি করেন।
হাইকোর্ট রুলে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের—ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব, বিটিআরসি চেয়ারম্যান, অর্থ সচিব এবং স্পেকট্রাম বিভাগের মহাপরিচালক—চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের উত্তর দিতে নির্দেশ দেন। আদালত জিজ্ঞাসা করেছে কেন নিলাম প্রক্রিয়াকে অবৈধ বা সংবিধানবিরোধী ঘোষণা না করে তা বাতিল করা হয়নি।
হাইকোর্টের রুলে দুইটি মূল উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রথমটি হল, বর্তমান নিলাম কাঠামো কি বাজারে প্রতিযোগিতা হ্রাস করে এবং একক অপারেটরের আধিপত্য বাড়ায়? দ্বিতীয়টি হল, রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিটক এবং ক্ষুদ্র অপারেটরদের সুরক্ষা না দিয়ে নিলাম পরিচালনা করা কি সংবিধানের লঙ্ঘন হতে পারে।
রাইসা মৃধা সামান্তা নিলাম বিরোধের পেছনে তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও নাগরিক দায়িত্বের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, গত এক‑দেড় বছর ধরে ইন্টারনেট প্যাকেজের দাম ও বৈধতা নিয়ে তিনি অসন্তোষে আছেন। টেলিটকের ১ গিগাবাইট প্যাকেজের মূল্য মাত্র ১৬ টাকা, যেখানে গ্রামীণফোনের সমমানের প্যাকেজের দাম ৪০‑৪৫ টাকা। তাছাড়া, ভারত ও শ্রীলঙ্কার মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে ডেটা প্যাকেজের মেয়াদ শেষ না হয়ে চলতে থাকে, যা বাংলাদেশের ব্যবহারকারীদের জন্য অসুবিধা সৃষ্টি করে।
সামান্তা আরও উল্লেখ করেন, জুলাই ২০২১-এ গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ছয় মাসের বেশি সময় রাস্তায় ছিলেন। তিনি বলেন, আন্দোলনের মুখ্য শক্তি ছিল সাধারণ মানুষ, এবং এখন যদি ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছতা না বজায় থাকে, তবে জনগণকে কে রক্ষা করবে।
বিটিআরসি পূর্বে বেশ কয়েকজন চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই মামলাগুলোতে উল্লেখিত অর্থ জনসাধারণের সম্পদ হিসেবে বিবেচিত, যা নিলামের স্বচ্ছতা ও জনস্বার্থ রক্ষার প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের সুষ্ঠু বরাদ্দ না হলে 5G নেটওয়ার্কের বিস্তার ধীর হবে এবং গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেটের গতি ও দামের পার্থক্য বাড়তে পারে। তাই নিলাম প্রক্রিয়ার ন্যায্যতা ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা দেশের ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য অপরিহার্য।
বিটিআরসি এখন পর্যন্ত নিলামের পুনরায় পরিকল্পনা বা নতুন শর্তাবলী প্রকাশ করেনি। তবে হাইকোর্টের রুল অনুসারে, সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে চার সপ্তাহের মধ্যে তাদের ব্যাখ্যা জমা দিতে হবে, যা নিলামের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই প্রেক্ষাপটে, টেলিকম শিল্পের বিভিন্ন সংস্থা ও নাগরিক সমাজের গোষ্ঠী নিলাম প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা এবং জনস্বার্থের সুরক্ষার জন্য তীব্রভাবে নজর রাখছে। নিলামের ফলাফল দেশের 5G কৌশল এবং দূরবর্তী অঞ্চলে সাশ্রয়ী ইন্টারনেট সেবার বিস্তারে সরাসরি প্রভাব ফেলবে।



