ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সোমবার বিকেএমইএ (বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন) ও বিজিএমইএ (বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স ও রফতানিকারক সমিতি) যৌথভাবে একটি সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে। সম্মেলনে উপস্থিত শিল্প নেতারা গার্মেন্টস খাতের বর্তমান আর্থিক অবস্থা, কাঁচামাল সরবরাহের সমস্যার প্রভাব এবং সরকারী সহায়তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গার্মেন্টস শিল্প এখন আইসিইউতে (ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিট) রয়েছে; জুটের পর এখন গার্মেন্টস শিল্পও ধ্বংসের মুখে। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের উৎপাদনকারীরা খুবই কম মার্জিনে কাজ করে এবং যখন সস্তা সুতা সহজে পাওয়া যায়, তখন উচ্চ দামের সুতা কেনা যুক্তিসঙ্গত নয়। অন্য শিল্পকে রক্ষা করার নামে গার্মেন্টস শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করা তিনি অস্বীকার করেন।
হাতেম সরকারকে আহ্বান জানান, স্পিনিং মিলগুলোকে অতিরিক্ত সুবিধা প্রদান করে দেশীয় শিল্প রক্ষার উদ্যোগ নিতে। তিনি জোর দেন, কাঁচামালের দাম কমে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে তা গ্রহণের ব্যবস্থা করা উচিত, যাতে গার্মেন্টস উৎপাদনের খরচ কমে এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতা বজায় থাকে।
বিজিএমইএর পরিচালক ফয়সাল সামাদও একই দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, গার্মেন্টস রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় সুতা ও অন্যান্য কাঁচামালের বাজার উন্মুক্ত না হলে শিল্পের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবে। সামাদ দেশের স্পিনিং মিলগুলোকে আন্তর্জাতিক মানের সুতা প্রতিযোগিতামূলক দরে সরবরাহ করতে সক্ষম হলে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান বলেন, বর্তমান সময়ে দেশীয় স্পিনিং মিলের সুতা প্রতি কেজিতে ৪৬ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে, যা আমদানি করা সুতা থেকে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য। তিনি উল্লেখ করেন, সরকার আমদানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে কৃত্রিম সুরক্ষার আড়ালে সুতার একচেটিয়া বাজার গড়ে তুলছে, যা গার্মেন্টস উৎপাদনের খরচ বাড়াচ্ছে।
রহমান আরও জানান, ভারত থেকে সুতা আমদানি করলে খরচ কম হয়। আন্তর্জাতিক মানের সুতা যদি প্রতিযোগিতামূলক দরে পাওয়া যায়, তবে দেশীয় শিল্পের জন্য প্রতি কেজিতে ১০ থেকে ১৫ সেন্ট (১২ টাকা থেকে ১৮.৫০ টাকা) বেশি দামে হলেও তা গ্রহণযোগ্য হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, গার্মেন্টস শিল্পের রপ্তানি আয় দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮২ শতাংশ গঠন করে, যার মধ্যে নিট পোশাক (নিট গার্মেন্টস) খাতের অবদান ৫৫ শতাংশ।
অধিকন্তু, বর্তমান অর্থবছর (২০২৫-২৬) জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত গার্মেন্টস রপ্তানি গত বছরের তুলনায় ২.৬৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে ডিসেম্বর মাসে রপ্তানি ১৪.২৩ শতাংশ কমে গিয়েছে। এই পতন গার্মেন্টস শিল্পের আর্থিক স্বাস্থ্যের ওপর চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। সেলিম রহমান সতর্ক করেন, যদি সুতার দাম উচ্চে থাকে, তবে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা কম দামের বিকল্প দেশে সরিয়ে নেবে, ফলে অর্ডার কমে যাবে এবং রপ্তানিকারকরা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
সারসংক্ষেপে, গার্মেন্টস শিল্পের বর্তমান সংকটের মূল কারণ কাঁচামালের উচ্চ দাম, সরকারী নীতির অপ্রতুলতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান হ্রাস। শিল্প নেতারা স্পিনিং মিলের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো, সুতার আমদানি সহজ করা এবং কৃত্রিম সুরক্ষা সরিয়ে দিয়ে বাজারকে স্বচ্ছ করা দাবি করেন। এসব পদক্ষেপ গার্মেন্টস রপ্তানির পুনরুদ্ধার এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ বলে তারা জোর দিয়ে বলেন।
গার্মেন্টস শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সরকারী নীতি, কাঁচামাল সরবরাহের স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা পূরণের সক্ষমতার ওপর। শিল্পের বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করে, নীতিনির্ধারকদের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া এবং বাজারের কাঠামোকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা জরুরি।



