১৯ জানুয়ারি সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিসি) সদর দফতরে একটি প্রেস ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রথম সাক্ষ্যগ্রহণের সূচনা সম্পর্কে মন্তব্য করেন। তিনি উল্লেখ করেন, কোনো সরকারি পদ বা ইউনিফর্মে থাকা ব্যক্তি যদি অপরাধ করে, তবে তাকে আইনের সামনে দাঁড়াতে হবে এবং জবাবদিহি করতে হবে।
প্রসিকিউটর জোর দিয়ে বলেন, আইসিসি বাংলাদেশের প্রতি যে প্রতিশ্রুতি নিয়েছে, তা হল বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে দেশকে মুক্ত করা। গত সতেরো বছর ধরে চলা অন্ধকার শাসনের অবসান ঘটিয়ে অপরাধীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এই প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য। তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়া শুরু করার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একটি স্পষ্ট বার্তা পাঠানো হচ্ছে।
তাজুল ইসলাম অতীত সরকারের সময় গুমকে একটি স্বাভাবিক প্রথা হিসেবে গড়ে তোলার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোকে ব্যবহার করে যেকোনো ব্যক্তিকে অদৃশ্য করে দেওয়া হতো এবং এর জন্য কোনো দায়িত্ব নেওয়া হতো না। এ ধরনের প্রথা জাতির নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারকে ক্ষুন্ন করে, তাই এই মামলাটি জাতীয় স্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সেই দিনের সকালে ট্রাইব্যুনাল-১-এ গুমের মামলায় প্রথম সাক্ষী হিসেবে বিএনপি নেতা হুম্মাম কাদের চৌধুরীর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। তার বর্ণনা অনুযায়ী, গোপন বন্দিশালায় বন্দীরা অমানবিক শর্তে রাখা হয়, যেখানে দিন-রাতের পার্থক্য স্পষ্ট ছিল না। তিনি জানান, বাড়ি থেকে নেওয়ার পর আটক হওয়ার কথা অস্বীকার করা হতো এবং বন্দীদের মাথায় জমটুপি পরিয়ে রাখা হতো।
গোপন বন্দিশালার অভ্যন্তরে আলো-আঁধার না থাকায় বন্দীরা কখনো সূর্যের আলো দেখেনি। চিকিৎসা সেবা না থাকায় অসুস্থ হলে কীভাবে সেবা পাবে, তা অজানা ছিল। তাছাড়া, ওষুধের গায়ে কী লেখা আছে, তা জানার সুযোগও না পেতেন। এসব শর্তে বন্দীরা মানসিক ও শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল।
প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম উল্লেখ করেন, গোপন বন্দিশালায় আট বছর পর্যন্ত মানুষকে আটকে রাখার উদাহরণ রয়েছে। যারা দেশের স্বাধীনতা, সমতা ও বাকস্বাধীনতার জন্য গুম হয়েছেন, তাদের আত্মা শান্তি পাবে না যদি ন্যায়বিচার না হয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, গুমের সংস্কৃতি চিরতরে শেষ করা দরকার।
আইসিসি এই মামলায় প্রমাণ সংগ্রহের জন্য আন্তর্জাতিক তদন্ত দল গঠন করেছে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখছে। ভবিষ্যতে আরও সাক্ষী ও প্রমাণ উপস্থাপনের জন্য শিডিউল নির্ধারিত হয়েছে। পরবর্তী শুনানির তারিখ আগামী সপ্তাহে নির্ধারিত, যেখানে অতিরিক্ত সাক্ষীর জবানবন্দি নেওয়া হবে।
প্রসিকিউটর আরও জানান, এই মামলায় জড়িত সকল সংস্থা ও ব্যক্তির ওপর কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি উল্লেখ করেন, আইসিসি বাংলাদেশের আইনগত কাঠামোকে শক্তিশালী করতে এবং ভবিষ্যতে গুমের ঘটনা রোধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে কাজ করবে।
বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ট্রাইব্যুনাল সব ধাপের রেকর্ড পাবলিকভাবে প্রকাশ করবে। এদিকে, গুমের শিকারদের পরিবারগুলোকে আইসিসি থেকে সমর্থন ও তথ্য সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
এই মামলায় বিচারিক প্রক্রিয়া চলাকালীন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও পর্যবেক্ষণ করবে এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদান করবে। তাজুল ইসলাম উল্লেখ করেন, গুমের সংস্কৃতি দূর করতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।
সারসংক্ষেপে, আইসিসি চিফ প্রসিকিউটর enforced disappearance মামলায় ইউনিফর্মধারী কর্মকর্তাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দৃঢ় সংকল্প প্রকাশ করেছেন এবং ভবিষ্যতে আরও তদন্ত ও শুনানির মাধ্যমে গুমের শিকারদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার নিশ্চিত করার পরিকল্পনা জানিয়েছেন।



