সরকার আদালতের আদেশ অনুসারে নাসা গ্রুপের সম্পত্তি বিক্রি করে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও সার্ভিস বেনিফিট পরিশোধের পরিকল্পনা জানিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এম. সাখাওয়াত হোসেন রোববার সচিবালয়ের একটি পর্যালোচনা সভায় প্রকাশ করেন।
সাক্ষাত্কারে উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন উল্লেখ করেন, আদালতের অনুমোদন পেয়ে নাসা গ্রুপের সম্পত্তি বিক্রির মাধ্যমে কর্মচারীদের আইনানুগ বেতন ও সুবিধা প্রদান করা হবে। তিনি আরও জানান, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শ্রমিকদের আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থা দ্রুত সেরে তোলা।
মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে, বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রম ও ব্যবসায়িক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার জন্য উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির পঞ্চদশ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার সভাপতিত্বে সাখাওয়াত হোসেন ছিলেন।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, আদালতের আদেশের ভিত্তিতে নাসা গ্রুপের শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে ইতিমধ্যে ৭৬ কোটি টাকা শ্রমিকদের কাছে প্রদান করা হয়েছে। এই অর্থটি আদালত নিযুক্ত প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে সরাসরি বিতরণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় নাসা গ্রুপ আটটি ব্যাংকের ডাউন পেমেন্ট সম্পন্ন করেছে। এই পদক্ষেপটি ব্যাংক সেক্টরের তরলতা রক্ষা এবং ঋণ পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।
বাকি ১৫টি ব্যাংকের ডাউন পেমেন্ট এবং শ্রমিকদের বকেয়া বেতন মেটাতে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী নাসা গ্রুপের কিছু সম্পত্তি উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বিক্রি করা হবে। এই পদ্ধতি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে এবং সম্পত্তির সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করে।
সাক্ষাত্কারে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর, শিল্পাঞ্চল পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক, পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অংশ নেন।
নাসা গ্রুপের প্রশাসক, কোম্পানির প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তারাও সভায় উপস্থিত ছিলেন, যা সিদ্ধান্তের বাস্তবায়নকে ত্বরান্বিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আত্মগোপনে চলে যান। তিনি এক্সিম ব্যাংকেরও চেয়ারম্যান ছিলেন। ২ অক্টোবর তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের কয়েকটি মামলায় অভিযুক্ত করা হয়।
চেয়ারম্যানের গ্রেপ্তার এবং গ্রুপের নেতৃত্বের অস্থিরতা নাসা গ্রুপের কারখানাগুলিতে কর্মসংস্থান সংকটের সৃষ্টি করে। শ্রমিকদের বেতন ও ভাতা বকেয়া হয়ে থাকে, ফলে কর্মচারীরা প্রতিবাদে নামেন।
গত বছর সেপ্টেম্বর কলকারখানা প্রতিষ্ঠান ও পরিদর্শন অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে শ্রমিক নেতাদের অংশগ্রহণে ত্রিপক্ষীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ঐ সভায় নাসা গ্রুপের ১৬টি কারখানা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা উৎপাদন ক্ষমতা ও বাজারে সরবরাহের ওপর প্রভাব ফেলেছে।
এই পদক্ষেপগুলো নাসা গ্রুপের আর্থিক পুনর্গঠন এবং শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। সম্পত্তি বিক্রির মাধ্যমে প্রাপ্ত তহবিল সরাসরি বকেয়া বেতন মেটাতে ব্যবহার করা হলে, শ্রমিকদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং উৎপাদন পুনরায় চালু করার সম্ভাবনা বাড়বে।
অন্যদিকে, ব্যাংক সেক্টরে নাসা গ্রুপের ঋণ পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে, ঋণদাতাদের ক্ষতি কমে যাবে এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে। তবে সম্পত্তি বিক্রির সময় বাজারের চাহিদা ও মূল্য নির্ধারণের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে অনুরূপ সমস্যার পুনরাবৃত্তি রোধ করা যায়।
সারসংক্ষেপে, আদালতের আদেশে নাসা গ্রুপের সম্পত্তি বিক্রি এবং শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধের উদ্যোগ সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টার ফল। এই পদক্ষেপগুলো শ্রমিকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গ্রুপের আর্থিক স্বাস্থ্যের পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে। ভবিষ্যতে সম্পত্তি বিক্রির মাধ্যমে প্রাপ্ত তহবিলের সঠিক ব্যবহার এবং ব্যাংক ঋণ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নাসা গ্রুপের পুনরুজ্জীবন ও বাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার মূল চাবিকাঠি হবে।



