যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি উদাসীনতা নিয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেসের মন্তব্য আজ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। গুতেরেসের মতে, যুক্তরাষ্ট্র তার ক্ষমতা ও স্বার্থকে আন্তর্জাতিক আইনের চেয়ে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, ফলে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার মৌলিক নীতিগুলো ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এই উদ্বেগের পটভূমি হল সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ, যা আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ডকে উপেক্ষা করার ইঙ্গিত দেয়।
গুতেরেস উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি দৃঢ় ধারণা রয়েছে যে বহুপক্ষীয় সমাধানগুলো আর প্রাসঙ্গিক নয়। তিনি বলেন, ওয়াশিংটন সরকার প্রায়শই একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে সমন্বয়কে অপ্রয়োজনীয় বলে গণ্য করে। এই মনোভাবের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি প্রণয়নে আন্তর্জাতিক আইনের ভূমিকা হ্রাস পেয়েছে।
মহাসচিবের বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য হল তার ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও সামরিক ক্ষমতা ব্যবহার করে স্বার্থ রক্ষা করা। কখনও কখনও এই প্রয়োগ আন্তর্জাতিক আইনের সীমা অতিক্রম করে, যা বৈশ্বিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। গুতেরেস জোর দিয়ে বলেন, এমন আচরণ আন্তর্জাতিক আইনের স্বীকৃতি ও প্রয়োগকে দুর্বল করে।
কয়েক সপ্তাহ আগে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি ইউরোপে ব্যাপক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে। এই ঘটনাগুলো গুতেরেসকে উদ্বিগ্ন করে, কারণ তারা আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার উপর আঘাত হানে এবং যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা পদক্ষেপকে উৎসাহিত করে। তিনি উল্লেখ করেন, এই ধরনের কর্মকাণ্ড বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য হুমকি স্বরূপ।
গুতেরেসের মতে, জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাকালীন নীতিগুলো, বিশেষত সদস্য রাষ্ট্রের সমতার নীতি, বর্তমানে ঝুঁকির সম্মুখীন। তিনি বলেন, বড় শক্তিগুলো যখন নিজেদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন এই নীতিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে, সংস্থার মৌলিক কাঠামো ও কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও জাতিসংঘের কঠোর সমালোচনা করেছেন। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সংস্থার অস্তিত্বের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং দাবি করেন যে তিনি একাই সাতটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটিয়েছেন, যেখানে জাতিসংঘ কোনো ভূমিকা রাখেনি। ট্রাম্পের এই মন্তব্যগুলো যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতি অবিশ্বাসের প্রকাশ।
গুতেরেস স্বীকার করেন, জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগে বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সংগ্রাম করছে। তবু তিনি উল্লেখ করেন, সংস্থা বড় বড় বৈশ্বিক সংঘাতের সমাধানে সক্রিয়ভাবে কাজ করে আসছে। তবে, তার ক্ষমতা সীমিত, কারণ বাস্তবিক চাপ প্রয়োগের ক্ষমতা প্রধান শক্তিগুলোর হাতে বেশি।
মহাসচিব জোর দিয়ে বলেন, বড় শক্তিগুলোর অতিরিক্ত প্রভাব কি টেকসই সমাধান আনতে সক্ষম, নাকি তা কেবল স্বল্পমেয়াদী সমাধানে সীমাবদ্ধ, তা স্পষ্ট নয়। তিনি এই পার্থক্যকে তুলে ধরে আন্তর্জাতিক শাসনের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রশ্ন তোলেন।
গুতেরেসের মতে, সংস্থার সংস্কার প্রয়োজন, যাতে ১৯৩টি সদস্য দেশের সম্মুখীন গুরুতর সমস্যাগুলো কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা যায়। তিনি উল্লেখ করেন, কিছু দেশ এখনো বিশ্বাস করে যে ক্ষমতার আইনকে আন্তর্জাতিক আইনের বদলে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। এই দৃষ্টিভঙ্গি সংস্থার নীতিগত ভিত্তিকে দুর্বল করে।
সংস্থার বর্তমান চ্যালেঞ্জের মুখে গুতেরেসের বার্তা স্পষ্ট: আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান ও সদস্য রাষ্ট্রের সমতার নীতি পুনরায় প্রতিষ্ঠা না করা পর্যন্ত বৈশ্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হবে। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানান, যুক্তরাষ্ট্রসহ সব বড় শক্তি যেন তাদের প্রভাবকে আইনের শাসনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ব্যবহার করে, যাতে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।



