সোশ্যাল সিকিউরিটি ও আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির সভা শেষে ১৯ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, দেশের সর্বত্র অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মোট ৪১৮টি ড্রোন মোতায়েন করা হবে। এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হল ভোটার, প্রার্থী ও নির্বাচন কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং কোনো অনিয়ম দ্রুত চিহ্নিত করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
সভায় উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, ড্রোনের সংখ্যা ও বণ্টন নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে ভাগ করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর দায়িত্বে থাকবে দুইশোটি ড্রোন, নৌবাহিনীর ছয়টি, বাংলাদেশ গার্ডের একশোটি, পুলিশ বাহিনীর পঞ্চাশটি, কোস্ট গার্ডের বিশটি, র্যাবের ষোলোটি এবং বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর আর ষোলোটি ড্রোন ব্যবহার করা হবে।
ড্রোনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের কুকুর স্কোয়াডকে নির্বাচনি নিরাপত্তা কার্যক্রমে যুক্ত করবে। কুকুর স্কোয়াডের কাজ হবে অপ্রয়োজনীয় বস্তু ও বিস্ফোরক সনাক্তকরণ, পাশাপাশি ভিড় নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা। এই সমন্বিত পদ্ধতি নির্বাচনের সময় সম্ভাব্য হুমকি দ্রুত সনাক্ত করে তা মোকাবেলা করতে সহায়তা করবে।
নির্বাচন সুরক্ষা অ্যাপ‑২০২৬, যা ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) প্রস্তুত করেছে, এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় প্রযুক্তি হিসেবে কাজ করবে। অ্যাপের মাধ্যমে ভোটার ও নাগরিকরা সরাসরি আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত অভিযোগ জানাতে পারবে, আর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে তথ্য গ্রহণ করে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারবে।
অ্যাপের কার্যক্রমকে সমর্থন করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুমে রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা উপস্থিত থাকবে। এই কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে ড্রোন, কুকুর স্কোয়াড এবং অন্যান্য নিরাপত্তা ইউনিটের সমন্বয় নিশ্চিত করা হবে, যাতে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটলে তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।
দূরবর্তী ও কঠিন প্রবেশযোগ্য এলাকায় ভোটের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যালট, ভোটার তালিকা ও অন্যান্য নির্বাচন সামগ্রী পরিবহনের জন্য বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হবে। হেলিকপ্টারগুলো বিশেষভাবে সজ্জিত থাকবে, যাতে নিরাপদ ও সময়মতো সামগ্রী পৌঁছানো যায় এবং নির্বাচনের সময় কোনো বিলম্ব না হয়।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জোর দিয়ে বলেন, নির্বাচনের সময় কোনো অবৈধ কার্যক্রম বা দুষ্কৃতিকারীর উপস্থিতি দ্রুত গ্রেফতার করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি উল্লেখ করেন, নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বাধা দিতে পারে এমন কোনো ধরনের অনিয়ম বা হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে মধ্যস্থ সরকার কঠোর পদক্ষেপ নেবে।
বিরোধী দলগুলোও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যাপকতা নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেছে। তারা দাবি করে, অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভোটারদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার অধিকারকে সীমাবদ্ধ করতে পারে এবং স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়ার জন্য সমন্বিত ও ন্যায়সঙ্গত পদ্ধতি প্রয়োজন। তবে সরকারী পক্ষের মতে, নিরাপত্তা বাড়ানোই ভোটার ও প্রার্থীর সুরক্ষা নিশ্চিত করার একমাত্র উপায়।
নির্বাচনের চার দিন আগে থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিবিড় টহল চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে চরাঞ্চল ও দুর্গম এলাকায় বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বয়ে টহল কার্যক্রম বাড়ানো হবে, যাতে অপ্রয়োজনীয় প্রতিবন্ধকতা দূর করা যায় এবং ভোটারদের নিরাপদে ভোট দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত হয়।
এই টহল পরিকল্পনায় গাড়ি, মোটরসাইকেল, পায়ে হেঁটে চলা টহল দল এবং ড্রোনের সমন্বয় থাকবে। টহল দলগুলো স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে সম্ভাব্য ঝুঁকি সনাক্ত করবে এবং তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে।
প্রস্তুতকৃত নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে বলে সরকারী সূত্রে আশা প্রকাশ করা হয়েছে। ড্রোন, কুকুর স্কোয়াড, হেলিকপ্টার এবং ডিজিটাল অ্যাপের সমন্বিত ব্যবহার ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দ্রুত তথ্য আদানপ্রদানকে সম্ভব করবে।
অবশেষে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে, নির্বাচনের পরও নিরাপত্তা তদারকি অব্যাহত থাকবে, যাতে ফলাফল প্রকাশের পর কোনো অনিয়মের সম্ভাবনা না থাকে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থা বজায় থাকে।



