জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ গত সপ্তাহে বাডেন-ভুর্টেমবার্গে নির্বাচনী সফরের সময় কর্মক্ষেত্রের বর্তমান অবস্থা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে জার্মান কর্মচারীরা গড়ে বছরে প্রায় তিন সপ্তাহের সমান, অর্থাৎ ১৪.৫ দিনের অসুস্থতার ছুটি গ্রহণ করছেন, যা দেশের উৎপাদনশীলতাকে প্রভাবিত করছে। মের্জের মতে, কোভিড‑১৯ মহামারির সময় চালু হওয়া ফোনে অসুস্থতার নোট (সিক নোট) ব্যবস্থা এখন আর যুক্তিসঙ্গত নয়।
চ্যান্সেলর মের্জ জোর দিয়ে বলেন যে, স্থবির অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে কর্মীদের কঠোর পরিশ্রমের প্রয়োজন, না যে তারা বারবার অসুস্থতার ছুটি নিয়ে কাজ থেকে দূরে থাকে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “এ ধরনের ব্যবস্থা কি এখনো প্রয়োজনীয়, নাকি তা আর কাজের মানসিকতা উন্নত করতে পারে না?” এই মন্তব্যের পেছনে রয়েছে ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান, যেখানে কর্মী প্রতি গড় অসুস্থতার দিন সংখ্যা ১৪.৫ হিসেবে রেকর্ড হয়েছে।
মের্জের দীর্ঘদিনের বার্তা হল জার্মানদেরকে অধিক সময় কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করা। পূর্বে তিনি এক বাণিজ্যিক সভায় উল্লেখ করেন যে, ওয়ার্ক‑লাইফ ব্যালেন্স বা চার দিনের কর্মসপ্তাহের ধারণা দেশের বর্তমান সমৃদ্ধি বজায় রাখতে যথেষ্ট নয় এবং উচ্চতর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। এই দৃষ্টিভঙ্গি এখনো তার নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলছে।
অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২২ সালে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা জার্মানির জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সস্তা রাশিয়ান জ্বালানি আমদানি বন্ধ করার ফলে জার্মানির শিল্প ও গৃহস্থালী খাতের খরচ বেড়েছে, যা অর্থনীতির গতি ধীর করে দিয়েছে। ফলস্বরূপ, ২০২৩ এবং ২০২৪ সালে জার্মানির জিডিপি ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়েছে, যা ২০০০‑এর দশকের শুরুর পর প্রথম দু’বছরের অবনতি।
মের্জ গত আগস্টে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দেশের সামর্থ্যের বাইরে চলে গেছে এবং তা মোকাবেলায় তৎপরতা প্রয়োজন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, এই চ্যালেঞ্জের মুখে দেশকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, নতুবা আর্থিক সংকট আরও বাড়তে পারে।
অর্থনৈতিক সমস্যার পাশাপাশি, মের্জ রাশিয়ার সম্ভাব্য হুমকির কথাও উল্লেখ করে দেশের নিরাপত্তা নীতি শক্তিশালী করার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। মে মাসে তিনি জার্মান সশস্ত্র বাহিনীর রূপান্তরের পরিকল্পনা ঘোষণা করেন, যাতে জার্মানি ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রচলিত সেনাবাহিনীতে পরিণত হয়। এই প্রতিশ্রুতি দেশের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
মের্জের এই মন্তব্যগুলো জার্মান রাজনীতিতে কর্মসংস্কৃতি, স্বাস্থ্য নীতি এবং নিরাপত্তা কৌশল নিয়ে তীব্র বিতর্কের সূচনা করেছে। সমালোচকরা বলেন যে, কর্মী‑সুস্থতার ছুটি কমাতে অতিরিক্ত চাপ আরোগ্য সমস্যার দিকে নিয়ে যেতে পারে, আর সমর্থকরা যুক্তি দেন যে, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কাজের সময় বৃদ্ধি অপরিহার্য।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং সামরিক শক্তিবৃদ্ধি দুটোই মের্জের অগ্রাধিকার তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, একসাথে কাজ করা এবং জাতীয় ঐক্য বজায় রাখা ছাড়া উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে, জার্মান সরকার কীভাবে এই নীতি সমন্বয় করবে এবং কর্মীদের স্বাস্থ্য ও কাজের ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করবে, তা দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।
মের্জের এই অবস্থান এবং পরিকল্পনা জার্মানির অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নীতি গঠনে নতুন দিক নির্দেশ করবে, বিশেষ করে ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামো এবং শ্রম বাজারের সংস্কারে। পরবর্তী সময়ে, সংসদীয় আলোচনায় এই বিষয়গুলো কীভাবে সমাধান হবে, তা দেশের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মূল চাবিকাঠি হবে।



