রাশিয়া ফেডারেশন বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) এর অংশ হিসেবে ১৯ জানুয়ারি দুপুরে ঢাকা শহরের খামারবাড়ি এলাকায় অনুষ্ঠিত একটি অনুষ্ঠানে বাংলাদেশকে ৩০,০০০ টন পটাশ সার উপহার প্রদান করেছে। অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় এবং রাশিয়ার শীর্ষস্থানীয় সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান উরালকেমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথি হিসেবে কৃষি ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার ভি. খোজিন, WFP এর ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর ডেভিড থমাস, উরালকেম গ্লোবাল কোম্পানির হেড অব সেলস দিমিত্রি বোলদিরেভ এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) এর চেয়ারম্যান মো. ওসমান ভূঁইয়া অংশগ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান। সমাবেশে রাশিয়ার সার সরবরাহের পেছনের কূটনৈতিক উদ্দেশ্য ও দু’দেশের কৃষি সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
কৃষি উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী উল্লেখ করেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিবেশে খাদ্য ও সার সরবরাহ একটি বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং বিভিন্ন বৈশ্বিক সংকট কৃষি খাতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে, ফলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা পূর্বের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
চৌধুরী আরও জানান, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের কাছে ইউরিয়া ব্যতীত অন্যান্য সারের মোট মজুদ বর্তমানে ১০.৩৫ লাখ টন, যা ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। এই মজুদ বৃদ্ধি দেশের কৃষি উৎপাদন স্থিতিশীল করতে সহায়ক হবে বলে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন।
অতএব, রাশিয়ার উপহারকৃত পটাশ সার দেশের সেচ ও ফলন বাড়াতে সরাসরি ব্যবহার হবে। উরালকেমের প্রতিনিধিরা উল্লেখ করেন, এই সরবরাহের মাধ্যমে বাংলাদেশে পটাশের ঘাটতি কমে যাবে এবং কৃষকদের উৎপাদন খরচ হ্রাস পাবে।
অঞ্চলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে রাশিয়া-বাংলাদেশ কৃষি অংশীদারিত্বের সম্প্রসারণ দক্ষিণ এশিয়ার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাশিয়া পূর্বে একই প্রোগ্রামের মাধ্যমে মধ্য এশিয়া ও আফ্রিকায়ও অনুরূপ সহায়তা প্রদান করেছে।
বিশ্লেষকরা বলেন, এই ধরণের সরাসরি সারের দান উভয় দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করবে এবং ভবিষ্যতে প্রযুক্তি বিনিময়, যৌথ গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামের সম্ভাবনা তৈরি করবে। বিশেষ করে, রাশিয়ার আধুনিক সার উৎপাদন প্রযুক্তি বাংলাদেশে স্থানান্তরিত হলে উৎপাদন দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
বিএডিসির চেয়ারম্যান ওসমান ভূঁইয়া উল্লেখ করেন, সরকার ইতিমধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ধান উৎপাদনে ৬ শতাংশ, আলুতে ১৪ শতাংশ, পেঁয়াজে ২২ শতাংশ, সবজিতে ৩.৭০ শতাংশ এবং সরিষায় ৮৬ শতাংশ বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনে অতিরিক্ত পটাশ সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার খোজিন বলেন, দু’দেশের কৃষি সহযোগিতা কেবল বাণিজ্যিক নয়, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির মাধ্যমে সারা বিশ্বের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি যৌথ দায়িত্ব।
অনুষ্ঠানের পর, উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা ভবিষ্যৎ সহযোগিতার রোডম্যাপ নিয়ে আলোচনা করেন। রাশিয়া উরালকেমের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী সরবরাহ চুক্তি, প্রশিক্ষণ কর্মশালা এবং গবেষণা প্রকল্পের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশও রাশিয়ার প্রযুক্তিগত সহায়তা গ্রহণে উন্মুক্ত থাকার ইঙ্গিত দিয়েছে।
এই সারের দান আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে বিশ্লেষিত হচ্ছে। একই সময়ে, বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশগুলোকে পারস্পরিক সহায়তা বাড়াতে হবে, এটাই উভয় দেশের নেতৃত্বের মূল বার্তা।
সারসংক্ষেপে, রাশিয়া ৩০,০০০ টন পটাশ সার উপহার দিয়ে বাংলাদেশকে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে সহায়তা করেছে এবং দু’দেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করেছে। ভবিষ্যতে এই সহযোগিতা কীভাবে বিকশিত হবে তা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজরে থাকবে।



