রাশিয়ার শীর্ষ সার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান উরালকেমের ৩০,০০০ টন মিউরেট অব পটাশ (MOP) সার আজ ঢাকা শহরের বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদের সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশকে উপহার হিসেবে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই উপহারটি বিশ্বখাদ্য কর্মসূচি (WFP) এর কাঠামোর অধীনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে প্রদান করা হয়েছে। উপহারের হস্তান্তর অনুষ্ঠানে কৃষি উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, উরালকেমের সিইও দিমিত্রি কন্যায়েভ এবং রাশিয়া-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ সোসাইটির সভাপতি মিয়া সাত্তার উপস্থিত ছিলেন।
উরালকেমের প্রতিনিধিরা ঢাকা শহরের বাণিজ্যিক গুদাম থেকে সরাসরি সারা দেশ জুড়ে বিতরণের জন্য সারটি সরবরাহের প্রস্তুতি জানিয়েছেন। হস্তান্তর অনুষ্ঠানে উরালকেমের সিইও দিমিত্রি কন্যায়েভ উল্লেখ করেন, খনিজ সার দেশের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অপরিহার্য। তিনি বলেন, উরালকেম একটি বৃহৎ আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী হিসেবে দুর্বল অঞ্চলে খাদ্য নিরাপত্তা সমর্থনে দায়িত্ববোধ করে কাজ করে।
কৃষি উপদেষ্টা চৌধুরী জানান, বর্তমান বৈশ্বিক পরিবেশে খাদ্য ও সার সরবরাহের ঘাটতি প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি যুক্তি দেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং বিভিন্ন বৈশ্বিক সংকটের ফলে কৃষি খাতের ওপর চাপ বাড়ছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বের গুরুত্ব পূর্বের চেয়ে বেশি।
চৌধুরী আরও উল্লেখ করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাতের অনিয়মিততা, তাপমাত্রার উত্থান এবং অতিরিক্ত বন্যা কৃষকদের উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সার মূল্যের ওঠানামা স্থানীয় কৃষকদের জন্য আর্থিক বোঝা বাড়িয়ে তুলেছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে রাশিয়ার এই উপহারটি সময়োপযোগী এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
উল্লেখযোগ্য যে, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (BADC) বর্তমানে ১০.৩৫ লাখ টন নন-ইউরিয়া সারের সর্বোচ্চ মজুদ বজায় রেখেছে, যা ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠার পর সর্বোচ্চ স্তর। চৌধুরী বলেন, মধ্যবর্তী সরকারকালের সময়ে কৃষি খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে এবং এই মজুদই তার প্রমাণ।
উরালকেমের সিইও কন্যায়েভের মতে, মিউরেট অব পটাশ সারের ব্যবহার গম, ধান, আলু এবং পেঁয়াজের মতো প্রধান ফসলের ফলন স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সারের সঠিক ব্যবহার না করলে উৎপাদন হ্রাস পেতে পারে, যা সরাসরি খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির দিকে নিয়ে যায়।
রাশিয়া-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ সোসাইটির সভাপতি মিয়া সাত্তার বলেন, এই উপহারটি দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের প্রতীক এবং কৃষকদের সমর্থন, খাদ্য নিরাপত্তা শক্তিশালীকরণ এবং পারস্পরিক বিশ্বাস বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে আরও সমন্বিত প্রকল্পের মাধ্যমে দু’দেশের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পূর্বের তিন বছর তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ধান উৎপাদন ৬ শতাংশ, আলু উৎপাদন ১৪ শতাংশ এবং পেঁয়াজ উৎপাদন ২২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই উন্নতি মূলত আধুনিক সার ব্যবহার, উন্নত বীজ এবং কৃষি প্রযুক্তির সমন্বয়ের ফল।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, উরালকেমের এই উপহার বাংলাদেশকে মৌসুমী চাহিদা পূরণে সহায়তা করবে এবং সারের ঘাটতি কমিয়ে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি করবে। একই সঙ্গে, এই ধরনের আন্তর্জাতিক দান ভবিষ্যতে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের জন্য মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে।
উল্লেখ করা দরকার, এই উপহারের মাধ্যমে রাশিয়া ও বাংলাদেশ উভয়ই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়িয়ে তুলছে। উভয় দেশের কূটনীতিকরা ভবিষ্যতে কৃষি গবেষণা, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালু করার পরিকল্পনা করছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে উভয় দেশের কৃষি উৎপাদনশীলতা ও টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখবে।



