ঢাকা, ১৩ জানুয়ারি – ৪ বছর বয়সী মুসকান নামের মেয়ে ২৩ ঘণ্টার মধ্যে মুন অ্যালার্টের সাহায্যে উদ্ধার হয়ে তার মা‑বাবার কোলে ফিরে এসেছে। শিশুটি নিখোঁজ হওয়ার পর সিআইডি (অপরাধ তদন্ত বিভাগ) ১৩২১৯ নম্বরের ফ্রি হেল্পলাইন চালু করে তৎক্ষণাৎ তথ্য সংগ্রহ শুরু করে। তদুপরি, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এবং সিআইডি মিসিং চিলড্রেন সেল ০১৩২০০১৭০৬০ নম্বরে কল আসা তথ্য দ্রুত যাচাই করে সতর্কবার্তা জারি করা হয়।
মুন অ্যালার্ট ব্যবস্থা দেশের প্রথমবারের মতো জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা হিসেবে চালু হয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য হল নিখোঁজ শিশুর তথ্য তৎক্ষণাৎ জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দেওয়া। সিআইডি এই সিস্টেমের মাধ্যমে ফ্রি হেল্পলাইন ১৩২১৯ চালু করে, যাতে যে কোনো ব্যক্তি দ্রুত তথ্য জানাতে পারে। একই সঙ্গে ৯৯৯ জরুরি নম্বর ও সিআইডি মিসিং চিলড্রেন সেলেও তথ্য প্রদান করা যায়, যা তৎক্ষণাত্ যাচাই ও ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতে মুন অ্যালার্ট জারি করতে সহায়তা করে।
মুসকান হারানোর পর মুন অ্যালার্টের ফেসবুক পেজসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে সতর্কতা বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পেজে শিশুর বর্ণনা, শেষ দেখা স্থান ও সম্ভাব্য বিপদের তথ্য প্রকাশ করা হয়, ফলে সাধারণ মানুষ দ্রুত তথ্য শেয়ার করে অনুসন্ধানে অংশগ্রহণ করে। এই ধরনের সমন্বিত প্রচারণা তথ্যের বিস্তারকে ত্বরান্বিত করে এবং অনুসন্ধান দলকে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়।
প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সিআইডি দ্রুত যাচাই করে ঝুঁকি মূল্যায়ন করে মুন অ্যালার্ট জারি করে। সতর্কবার্তায় শিশুর ছবি, বর্ণনা ও সম্ভাব্য দিকনির্দেশনা উল্লেখ করা হয়, যাতে পুলিশ, গৃহহীন সেবা ও স্বেচ্ছাসেবকরা একসাথে কাজ করতে পারে। সতর্কবার্তা জারি হওয়ার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মুসকানের অবস্থান নির্ধারণ করা যায় এবং তাকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।
মুসকানকে উদ্ধার করার আগে, শামীম আহমদ নামের এক ব্যক্তি দ্বারা গৃহীত এক মেয়ের নিখোঁজের ঘটনা গড (জিডি) হিসেবে রিপোর্ট করা হয়েছিল, যা পরে হত্যার মামলায় রূপান্তরিত হয়েছে এবং বিচার এখনও চলমান। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মুন অ্যালার্টের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কারণ সমন্বিত সতর্কতা ব্যবস্থা না থাকলে নিখোঁজ শিশুর পুনরুদ্ধার প্রায়শই দীর্ঘ সময় নেয়।
মুন অ্যালার্টের ধারণা ১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অ্যাম্বার হ্যাগারম্যানের অপহরণ ও হত্যার পর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জনপ্রিয়তা পায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ৩২টি দেশে অ্যাম্বার অ্যালার্ট চালু হওয়ার পর মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, চীন, নাইজেরিয়া, কেনিয়া, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে নিজস্ব আইন ও প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অনুরূপ ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে। বাংলাদেশে এই ধারাকে মুন অ্যালার্ট নামে গ্রহণ করা হয়।
বাংলাদেশে মুন অ্যালার্টের পক্ষে দীর্ঘদিন কাজ করা ব্যক্তি হলেন সাদাত রহমান, যিনি অ্যাম্বার অ্যালার্ট ফর বাংলাদেশ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠাতা। আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার বিজয়ী সাদাত বর্তমানে জিরো মিসিং চিলড্রেন নামের সংস্থার প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করছেন এবং মুন অ্যালার্টের প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, সিআইডি মুন অ্যালার্টের বাস্তবায়নে অগ্রগতি করেছে এবং মেটা, বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমর্থন পেয়েছে।
মুন অ্যালার্টের কার্যক্রমে সিআইডি আইনগত ভিত্তি হিসেবে শিশু সুরক্ষা আইন ও অপরাধ সংক্রান্ত বিধান ব্যবহার করে। সিস্টেমের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহভাজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত চালু হয় এবং প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে যে নিখোঁজ শিশুর মামলায় দেরি না হয়ে অপরাধীকে বিচারের মুখে আনা যায়।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে মুন অ্যালার্ট সামাজিক মিডিয়া, এসএমএস ও ইমেইল নোটিফিকেশন ব্যবহার করে দ্রুত তথ্য প্রচার করে। সিআইডি বিশেষায়িত সফটওয়্যার দিয়ে তথ্যের সঠিকতা যাচাই করে এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগকে রিয়েল-টাইম আপডেট প্রদান করে। এই ডিজিটাল পদ্ধতি তথ্যের গতি বাড়িয়ে দেয় এবং অনুসন্ধান দলকে কার্যকরভাবে সমন্বয় করতে সহায়তা করে।
মুসকানকে নিরাপদে ফিরে পেয়ে তার পরিবার গভীর স্বস্তি প্রকাশ করেছে। সিআইডি ও স্বেচ্ছাসেবক দল শিশুটির শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। বর্তমানে শিশুটি হাসপাতালে পর্যবেক্ষণে রয়েছে এবং পরিবারকে মানসিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
মুন অ্যালার্টের সফলতা ভবিষ্যতে আরও বেশি নিখোঁজ শিশুকে দ্রুত উদ্ধার করার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেবে। সিআইডি জনসাধারণকে আহ্বান জানিয়েছে যে কোনো সন্দেহজনক তথ্য তৎক্ষণাৎ হেল্পলাইন ১৩২১৯ অথবা ৯৯৯ নম্বরে জানাতে, যাতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া যায়। এছাড়া, সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে মুন অ্যালার্টের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো শক্তিশালী করতে এবং জনসচেতনতা বাড়াতে সমন্বিত কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে।
মুন অ্যালার্টের মাধ্যমে নিখোঁজ শিশুর তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া, জনসাধারণের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং আইনগত কাঠামোর সমন্বয় একসাথে কাজ করে সফল ফলাফল এনে দেয়। সিআইডি এই মডেলকে দেশের অন্যান্য অপরাধমূলক ঘটনার প্রতিরোধে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছে, যাতে ভবিষ্যতে আরও বেশি জীবন রক্ষা করা যায়।



