ইউএন সিক্রেটারি-জেনারেল অ্যান্টোনিও গুটেরেস সম্প্রতি ব্রিটিশ রেডিও ৪-এ টুডে প্রোগ্রামে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক নীতি সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে যুক্তরাষ্ট্র তার শক্তি ও প্রভাবকে আন্তর্জাতিক আইনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় এবং বহুপাক্ষিক সমাধানকে প্রায়ই অপ্রাসঙ্গিক বলে বিবেচনা করে।
গুটেরেসের মন্তব্যের পটভূমিতে সাম্প্রতিক কয়েকটি আমেরিকান পদক্ষেপ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপ করে দেশের প্রেসিডেন্টকে গ্রেপ্তার করেছে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড সংযুক্ত করার হুমকি আন্তর্জাতিক মঞ্চে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ঘটনাগুলি ইউএনের সমতা ও সার্বভৌমত্বের নীতিগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
ট্রাম্পের ইউএন সমালোচনা পূর্বে বহুবার শোনা গেছে। গত সেপ্টেম্বরের সাধারণ পরিষদে তিনি সংস্থাটিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেন, দাবি করেন যে তিনি একা সাতটি অমীমাংসিত যুদ্ধ শেষ করেছেন এবং ইউএন কোনোভাবে সেগুলোর সমাধানে সহায়তা করেনি। তার এই বক্তব্যে তিনি ইউএনের প্রাসঙ্গিকতা ও কার্যকারিতা নিয়ে তীব্র সন্দেহ প্রকাশ করেন।
গুটেরেস স্বীকার করেন যে ইউএন চুক্তি ও চার্টারের বিধানগুলো সদস্য রাষ্ট্রের ওপর প্রয়োগ করতে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। যদিও সংস্থা বৈশ্বিক সংঘাতের সমাধানে সক্রিয়ভাবে কাজ করে, তবু তার হাতে যথেষ্ট প্রভাবের অভাব রয়েছে। বড় শক্তিগুলোর তুলনায় ইউএনের প্রভাব সীমিত, ফলে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের বদলে স্বল্পমেয়াদী সমঝোতা বেশি দেখা যায়।
বৃহত্তর শক্তির প্রভাব কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা নিয়ে গুটেরেস প্রশ্ন তোলেন। তিনি উল্লেখ করেন যে এই প্রভাবের ব্যবহার প্রকৃত সমাধানের দিকে নিয়ে যায় নাকি কেবল অস্থায়ী সমঝোতার দিকে, তা স্পষ্ট নয়। এই পার্থক্যই আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।
সংস্থার অভ্যন্তরীণ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা গুটেরেস জোর দিয়ে বলেন। ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মুখোমুখি হওয়া জটিল সমস্যাগুলো মোকাবিলায় ইউএনকে নতুন কাঠামো ও প্রক্রিয়া গ্রহণ করতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, কিছু দেশ এখন আইনকে শক্তির আইন দিয়ে প্রতিস্থাপন করার ধারণা পোষণ করে, যা আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা ক্ষয় করে।
গুটেরেসের মতে, বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের নীতি স্পষ্টভাবে বহুপাক্ষিক সমাধানের অপ্রাসঙ্গিকতা এবং শক্তি ও প্রভাবের ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দেয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে গড়া শৃঙ্খলাকে দুর্বল করে এবং ছোট দেশগুলোর স্বার্থকে হুমকির মুখে ফেলে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেন যে, যদি বড় শক্তির স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বহুপাক্ষিক কাঠামোকে উপেক্ষা করা হয়, তবে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার কার্যকারিতা হ্রাস পাবে। এ ধরনের প্রবণতা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও পরিবেশ সংক্রান্ত চুক্তিগুলোর বাস্তবায়নেও বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
অবশেষে গুটেরেস উল্লেখ করেন, ইউএনকে তার মৌলিক নীতি—সদস্য রাষ্ট্রের সমতা ও আন্তর্জাতিক আইনের শাসন—পুনরায় নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আশাবাদী যে সংস্কারমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে সংস্থা তার প্রভাব বাড়িয়ে সত্যিকারের বহুপাক্ষিক সমাধান প্রদান করতে সক্ষম হবে।
এই আলোচনার পরবর্তী ধাপ হিসেবে ইউএন সদস্য দেশগুলোকে সংশ্লিষ্ট সংস্কার প্রস্তাবনা নিয়ে আলোচনা করতে হবে এবং বড় শক্তির প্রভাবকে সুষ্ঠু ও ন্যায়সঙ্গতভাবে ব্যবহার করার জন্য স্পষ্ট নিয়মাবলী গড়ে তুলতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এই বিষয়গুলো সমাধান করা ভবিষ্যৎ সংঘাতের প্রতিরোধে মূল চাবিকাঠি হবে।



