বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের মাঝারি‑থিকনেসের ইয়ার্নের জন্য বন্ডেড গুদাম সুবিধা থেকে শুল্ক‑মুক্ত আমদানি বন্ধের সুপারিশ করেছে। এই ধরণের ইয়ার্ন নিটওয়্যার উৎপাদনে ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয় এবং উচ্চ কাউন্ট মানে কম পুরুত্ব। মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে যে ভারত থেকে সস্তা ইয়ার্নের প্রবেশে দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো চাপে রয়েছে।
স্থানীয় স্পিনাররা এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে, কারণ শুল্ক‑মুক্ত ইয়ার্নের প্রবাহ কমে গেলে দেশীয় উৎপাদনকে সমর্থন করার সুযোগ বাড়বে। তারা দাবি করে, সস্তা আমদানি দামের তুলনায় দেশীয় উৎপাদনকে সুরক্ষিত করা দরকার, যাতে কর্মসংস্থান বজায় থাকে এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমে।
অন্যদিকে, প্রস্তুত পোশাক রপ্তানিকারক সংস্থাগুলো এই পদক্ষেপকে কঠোর সমালোচনা করেছে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকিএমইএ) উভয়ই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে শুল্ক‑মুক্ত ইয়ার্ন বন্ধ হলে উৎপাদন খরচ বাড়বে এবং দেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিজিএমইএ-র পরিচালক ফয়সাল সামাদ উল্লেখ করেন, শুল্ক‑মুক্ত ইয়ার্নের বন্ধে গার্মেন্টস শিল্পকে দেশীয় সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরশীল হতে হবে, যেখানে ইতিমধ্যে দাম বাড়ছে। তিনি বলেন, একাধিক সদস্য সংস্থা জরুরি বৈঠকে এই বিষয়টি তুলে ধরেছে এবং বাজারে একচেটিয়া অবস্থার ফলে দাম আরও বাড়তে পারে।
বিকিএমইএ-র এক্সিকিউটিভ প্রেসিডেন্ট ফজলি শামিম এহসান জানান, মোট ইয়ার্ন চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ আমদানি থেকে আসে, যার মূল্য প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার। অধিকাংশ আমদানি ভারত থেকে হয়, বাকি ৭০ শতাংশ দেশীয় স্পিনার সরবরাহ করে। তিনি যোগ করেন, দেশীয় মিলগুলো ইতিমধ্যে প্রতি কিলোগ্রামে ০.২৫‑০.৩০ ডলার মূল্যের বৃদ্ধি প্রস্তাব করছে।
উভয় সংস্থা আজই একটি প্রেস কনফারেন্সের আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে, যেখানে সরকারকে প্রস্তাবটি পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানানো হবে। তারা আশা করে, নীতি পরিবর্তনের ফলে গার্মেন্টস শিল্পের উৎপাদন খরচে অপ্রয়োজনীয় চাপ না পড়ে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেন, শুল্ক‑মুক্ত সুবিধা বাদ দিলে নিটওয়্যার উৎপাদনে ব্যবহৃত ১০‑৩০ কাউন্টের ইয়ার্নের দাম বাড়বে, ফলে গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারারদের মার্জিন সংকুচিত হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যগুলোকে মূল্য প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে।
দাম বৃদ্ধির ফলে কিছু রপ্তানিকারক অন্য দেশে উৎপাদন সরিয়ে নিতে পারে, যা বাংলাদেশের গ্লোবাল গার্মেন্টস র্যাঙ্ককে হুমকির মুখে ফেলবে। বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম গার্মেন্টস রপ্তানিকারক, এবং এই নীতি তার অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে।
সরকারের যুক্তি হল দেশীয় স্পিনিং শিল্পকে রক্ষা করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমানো। তবে এই পদক্ষেপটি গ্লোবাল অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে আসছে, যখন রপ্তানি শিল্প ইতিমধ্যে তীব্র মূল্য প্রতিযোগিতার মুখোমুখি।
যদি নীতি কার্যকর হয়, রপ্তানিকারকরা হয় দাম বাড়িয়ে গ্রাহকদের কাছে পণ্য বিক্রি করবে, অথবা খরচ শোষণ করে লাভের মার্জিন কমাবে। উভয় ক্ষেত্রেই ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বড় ক্রেতাদের অর্ডার প্রভাবিত হতে পারে।
স্বল্পমেয়াদে নতুন গার্মেন্টস অর্ডারের প্রবাহ ধীর হতে পারে, আর দীর্ঘমেয়াদে ফলাফল নির্ভর করবে দেশীয় স্পিনার কত দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে পারবে এবং দামকে প্রতিযোগিতামূলক রাখতে পারবে তার ওপর।
এই বিতর্কটি আমদানি‑বদল নীতি এবং রপ্তানি‑নির্ভর শিল্পের কম খরচ বজায় রাখার প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জকে তুলে ধরছে।
স্টেকহোল্ডাররা আজকের প্রেস কনফারেন্সের ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছে, যা বাংলাদেশের গার্মেন্টস সরবরাহ শৃঙ্খলের ভবিষ্যৎ দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



