জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই‑ডিসেম্বর) সরকারের মোট রাজস্ব ঘাটতি ৪৬,০০০ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে।
এই সময়ে লক্ষ্য করা মোট রাজস্ব আদায় ২,৩১,২০৫ কোটি টাকা ছিল, তবে বাস্তবে তিনটি প্রধান করখাতে মোট ৪৫,৯৮০ কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে।
আয়কর ক্ষেত্রে ঘাটতি সবচেয়ে বেশি, লক্ষ্য ছিল ৮৫,৪০৫ কোটি টাকা, কিন্তু আদায় মাত্র ৬১,৮৭৩ কোটি টাকা, ফলে ২৩,৫৩২ কোটি টাকার ঘাটতি রয়ে গেছে।
শুল্ক (কাস্টমস) আয়েও লক্ষ্য থেকে পিছিয়ে, ১২,১৪০ কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে; লক্ষ্য ছিল ৬৫,০০০ কোটি টাকা, তবে আদায় হয়েছে মাত্র ৫২,৮৬১ কোটি টাকা।
মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ক্ষেত্রেও ১০,৩০৮ কোটি টাকার ঘাটতি রেকর্ড হয়েছে; লক্ষ্য ছিল ৮০,৭৯৯ কোটি টাকা, কিন্তু সংগ্রহ হয়েছে ৭০,৪৯১ কোটি টাকা।
এই সংখ্যাগুলো দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতি ধীর হয়ে যাওয়ার প্রতিফলন। বিনিয়োগ প্রকল্পের স্থবিরতা, বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের অভাব এবং উৎপাদন শৃঙ্খলে অগ্রগতির ধীরগতি রাজস্বের পতনে সরাসরি ভূমিকা রাখছে।
শিল্প ও অবকাঠামো প্রকল্পে কাঁচামালের চাহিদা কমে যাওয়ায় আমদানি পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে, ফলে শুল্ক আয়ও কমে গেছে।
করদাতা কোম্পানিগুলো অগ্রিম আয়কর ও উৎসর করের মতো বাধ্যতামূলক কর জমা দিচ্ছে, তবে মোট করযোগ্য আয় হ্রাসের ফলে সংগ্রহের পরিমাণ লক্ষ্য থেকে কমে গেছে।
ব্যক্তিগত করদাতারাও বাস্তব আয় কমে যাওয়ায় কম ট্যাক্স দিচ্ছেন, যা আয়কর ঘাটতিতে অবদান রাখছে।
ভ্যাটের ঘাটতি মূলত ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের ফলে। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং বাস্তব মজুরির পতন গ্রাহকের ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে, ফলে বিক্রয় ও সেবার ওপর আরোপিত করের পরিমাণ কমে গেছে।
এই আর্থিক চ্যালেঞ্জগুলো নির্বাচনের কয়েক মাস আগে সরকারের বাজেটের নমনীয়তা সীমিত করছে, ফলে আর্থিক নীতি নির্ধারণে কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়িক গোষ্ঠী জানাচ্ছে যে বর্তমান অর্থনৈতিক গতি উচ্চ বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির পথে চলার সম্ভাবনা কমিয়ে দিচ্ছে; যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, রাজস্বের অবনতি স্বাভাবিক ফলাফল হবে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে বিনিয়োগের পুনরুজ্জীবন না হলে উভয়ই বেসরকারি ও সরকারি কর আয় লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হবে।
শুল্ক আয়ের লক্ষ্য ৬৫,০০০ কোটি টাকা ছিল, তবে বাস্তবে ৫২,৮৬১ কোটি টাকা সংগ্রহ হয়েছে, যা শিল্পের কাঁচামাল চাহিদার হ্রাসের সরাসরি ফলাফল।
ভ্যাট সংগ্রহের লক্ষ্য ছিল ৮০,৭৯৯ কোটি টাকা, কিন্তু আদায় হয়েছে ৭০,৪৯১ কোটি টাকা, যা ভোক্তা ব্যয়ের হ্রাসের স্পষ্ট চিত্র।
রাজস্ব ঘাটতি পূরণের জন্য সরকারকে হয় ঋণ গ্রহণ বাড়াতে হবে, অথবা ব্যয় পুনর্বিন্যাস করতে হবে; উভয়ই রাজনৈতিক দিক থেকে সংবেদনশীল।
নির্বাচন আসন্ন হওয়ায় রাজনৈতিক দলগুলো আর্থিক উদ্দীপনা প্রতিশ্রুতি দিতে পারে, তবে বাস্তবিক রাজস্বের সীমাবদ্ধতা নীতি বাস্তবায়নে বাধা হতে পারে।
স্বল্পমেয়াদে এই ঘাটতি সরকারকে দেশীয় ঋণ বাজারে আরও প্রবেশ করতে বাধ্য করতে পারে, যা ঋণ ব্যয়ের হার বাড়াতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে ধারাবাহিক রাজস্ব ঘাটতি স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অবকাঠামো প্রকল্পের তহবিল কমিয়ে দিতে পারে, ফলে উন্নয়নের গতি আরও ধীর হবে।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা কর সংস্কার, ভোক্তা আস্থা বাড়ানো এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করার জন্য নীতি প্রস্তাব করছেন, যা রাজস্বের ঘাটতি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, বর্তমান তথ্য নির্দেশ করে যে উৎপাদন ও ভোগের পুনরুজ্জীবন না হলে পরের অর্ধবছরে রাজস্ব ঘাটতি আরও বাড়তে পারে, যা আর্থিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করবে।



