ঢাকা শহরের শের‑ই‑বাংলা ট্রেড ফেয়ার প্রতি বছর জানুয়ারি মাসে বিশাল দর্শক স্রোত আকর্ষণ করে। পরিবারগুলো এই ইভেন্টকে ছুটির মতো মানে এবং শহরের বাণিজ্যিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গণ্য করে। ফেয়ারটি শুধু পণ্য প্রদর্শনই নয়, স্থানীয় অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিক্রয় মঞ্চও বটে।
বছরের শুরুতে শীতের হাওয়া, ধুলো এবং উজ্জ্বল আলোতে ঘেরা গেটের সামনে দীর্ঘ সারি দেখা যায়। বহু পরিবার, বিশেষ করে বয়োজ্যেষ্ঠরা, কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে অংশ নিতে একত্রিত হয়। এই ঐতিহ্যিক রীতিতে অংশগ্রহণের জন্য কেউই বাদ দেয় না, যদিও শীতের তাপমাত্রা কখনো কখনো কঠিন হতে পারে।
একটি স্মরণীয় উদাহরণ হল পিপলস সিরামিকের নীল চায়ের সেট, যা বহু দশক আগে ট্রেড ফেয়ারে বিক্রি হয়েছিল। সেটটি নীল ও লাল রঙের দুটি ডিনারওয়্যার নিয়ে গঠিত, যার পাতা-আকৃতির নকশা তখনকার ঢাকার গৃহস্থালিতে জনপ্রিয় ছিল। আজও অনেক পরিবার এই সেটকে পুরনো স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সংরক্ষণ করে, যা ফেয়ারের সাংস্কৃতিক প্রভাবের প্রমাণ।
১৯৭০-এর দশকে ফেয়ারটিতে সেরকমই সজীব পরিবেশ ছিল; সার্কাস, মোটরসাইকেল ঘূর্ণায়মান কেজ এবং ট্র্যাপেজে চড়া এক্রোব্যাটিক্স দর্শকদের মুগ্ধ করত। এই ধরনের বিনোদনমূলক কার্যক্রম ফেয়ারকে শুধু বাণিজ্যিকই নয়, বিনোদনমূলক কেন্দ্রেও পরিণত করেছিল।
মধ্য-১৯৭০-এর দশকে দাক্কা ট্রেড ফেয়ার স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংগঠিত বাণিজ্যিক প্রচারের সূচনা চিহ্নিত করে। এই উদ্যোগের পরবর্তী পর্যায়ে ১৯৯৫ সালে ঢাকা আন্তর্জাতিক ট্রেড ফেয়ার (ডিআইটিএফ) প্রতিষ্ঠিত হয়, যা দেশের বাণিজ্যিক নীতি ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের পথ সুগম করে।
আজকের ফেয়ারটি ঢাকার মানুষের জন্য একধরনের রীতি, যেখানে কাবাবের গন্ধ, বিভিন্ন পণ্যের প্রদর্শনী এবং কখনো কখনো অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার মিশ্রণ দেখা যায়। এই রীতির মাধ্যমে স্থানীয় উৎপাদক ও ভোক্তা সরাসরি সংযোগ স্থাপন করে, যা বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের সমন্বয়কে সহজ করে।
ফেয়ারের প্রবেশদ্বারে প্রথমে দেখা যায় কিয়াম মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের স্টল, যা কুষ্টিয়ার ভিত্তিক এবং বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ রান্নাঘরের পাত্র-প্রসাধন সরবরাহকারী। এই কোম্পানির পণ্যগুলো স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ মানের জন্য পরিচিত, ফলে ফেয়ারে এর উপস্থিতি বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করে।
লেখক নিজেও কিয়ামের স্টলে বহু বছর ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে আসছেন, বিশেষ করে চা বানানোর জন্য উপযুক্ত পাত্রের সন্ধানে। শেষমেশ এই বছর তিনি একটি বিশেষ ডিজাইনের চা পাত্র পেয়ে সন্তুষ্ট হন, যা মগের আকারে ঢাকনা ও মজবুত হ্যান্ডেলসহ তৈরি। এই পাত্রটি তার চাহিদা পূরণে সক্ষম, যা পূর্বে বিভিন্ন মডেল পরীক্ষা করার পরেও তিনি পাননি।
ফেয়ারে এই বছর নন‑স্টিক পাত্রের চাহিদা বিশেষভাবে বেড়েছে। হানিকম্ব নন‑স্টিক ফ্রাই প্যানের আধুনিক নকশা তেল কম ব্যবহার নিশ্চিত করে, ফলে স্বাস্থ্যসচেতন গ্রাহকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এই প্রবণতা রান্নাঘরের পণ্য বাজারে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করছে এবং উৎপাদনকারীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে ট্রেড ফেয়ার স্থানীয় শিল্পের বিক্রয় বৃদ্ধি, ব্র্যান্ডের দৃশ্যমানতা এবং নতুন পণ্য লঞ্চের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। উৎপাদকরা সরাসরি ভোক্তার প্রতিক্রিয়া পেয়ে পণ্যের উন্নয়ন ও মূল্য নির্ধারণে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ভবিষ্যতে এই ধরনের ইভেন্টের মাধ্যমে ডিজিটাল মার্কেটিং ও অনলাইন বিক্রয়ের সঙ্গে সমন্বয় ঘটিয়ে আরও বৃহত্তর বাজারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
সারসংক্ষেপে, শের‑ই‑বাংলা ট্রেড ফেয়ার ঢাকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক গতিশীলতার এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। পরিবারিক রীতি, ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং বাজারের চাহিদা একসাথে মিলিয়ে এই ইভেন্টকে ভবিষ্যতেও দেশের বাণিজ্যিক উন্নয়নের মূল স্তম্ভ হিসেবে ধরে রাখবে।



