ইউনাইটেড কিংডম, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে ১,০০০ স্বেচ্ছাসেবকের অংশগ্রহণে একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা চালু হয়েছে, যার লক্ষ্য আঙুলের রক্তের এক টুকরো দিয়ে আলঝেইমার রোগের প্রাথমিক সনাক্তকরণ সম্ভব করা। গবেষণাটি রক্তে উপস্থিত নির্দিষ্ট প্রোটিনের মাত্রা পরিমাপের মাধ্যমে রোগের ঝুঁকি নির্ণয় করার চেষ্টা করবে। এই পদ্ধতি যদি সফল হয়, তবে বর্তমানের জটিল ও ব্যয়বহুল পরীক্ষার বিকল্প হিসেবে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
গবেষণার নাম Bio‑Hermes‑002, যা মেডিকেল রিসার্চ চ্যারিটি LifeArc এবং Global Alzheimer’s Platform Foundation একসাথে পরিচালনা করছে, এবং যুক্তরাজ্যের Dementia Research Institute এর সমর্থন পাচ্ছে। গবেষণার মূল উদ্দেশ্য হল রক্তে উপস্থিত তিনটি প্রোটিনের ঘনত্ব বিশ্লেষণ করে আলঝেইমার রোগের সম্ভাব্য সূচক চিহ্নিত করা। এই প্রোটিনগুলোকে রক্ত‑ভিত্তিক বায়োমার্কার বলা হয়, এবং তাদের মাত্রা যদি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করে, তবে রোগের ঝুঁকি বাড়ে বলে ধারণা করা হয়।
লন্ডনের একজন সাধারণ চিকিৎসক মাইকেল স্যান্ডবার্গ, যিনি নিজের মায়ের আলঝেইমার রোগের ধীরগতির অবনতি প্রত্যক্ষ করে এই গবেষণায় অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ হন। তিনি পরীক্ষায় নেগেটিভ ফলাফল পেয়ে “বহু বড় স্বস্তি” প্রকাশ করেন, যা রোগের অগ্রিম সনাক্তকরণের মানসিক প্রভাবকে তুলে ধরে। তার অভিজ্ঞতা গবেষণার গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে, কারণ রোগীর পরিবার প্রায়শই নির্ণয়ের অনিশ্চয়তা ও দুঃখের মুখোমুখি হয়।
LifeArc এর স্ট্র্যাটেজি ও অপারেশনস ডিরেক্টর জিওভানা লালি উল্লেখ করেন, “আমরা তিনটি প্রোটিনের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি, যেগুলো আলঝেইমার রোগের সঙ্গে যুক্ত বলে জানা যায়। এই প্রোটিনের ঘনত্ব ও স্তর বিশ্লেষণ করে রোগীর ঝুঁকি নির্ধারণ করা সম্ভব হতে পারে।” তিনি আরও বলেন, রক্তের নমুনা থেকে এই তথ্য সংগ্রহ করা তুলনামূলকভাবে সহজ ও কম ব্যয়বহুল।
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যামিলয়েড ও টাউ নামের অস্বাভাবিক প্রোটিন মস্তিষ্কে জমা হতে পারে এবং রোগের লক্ষণ প্রকাশের প্রায় পনেরো বছর আগে থেকেই এই প্রক্রিয়া শুরু হয়। তাই রক্তে এই প্রোটিনের প্রাথমিক চিহ্ন ধরা রোগের অগ্রিম সনাক্তকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমানের স্বর্ণমানের পরীক্ষা, যেমন বিশেষায়িত PET স্ক্যান বা মেরুদণ্ডের তরল সংগ্রহের জন্য লাম্বার পাংচার, এই প্রোটিনের সরাসরি মাপের জন্য ব্যবহৃত হয়, তবে সেগুলো ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ এবং রোগীর জন্য অস্বস্তিকর।
গবেষণার সকল স্বেচ্ছাসেবককে একই সঙ্গে এই স্বর্ণমানের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাওয়া হবে, যাতে আঙুলের রক্ত পরীক্ষার ফলাফলকে ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির সঙ্গে তুলনা করা যায়। বর্তমানে আলঝেইমার রোগে আক্রান্ত রোগীর মাত্র দুই শতাংশই এই উচ্চমানের পরীক্ষার সুবিধা পায়, যা রোগের সঠিক নির্ণয়কে সীমিত করে। গবেষকরা আশা করেন, রক্তের এক টুকরো দিয়ে নির্ভরযোগ্য ফলাফল পাওয়া গেলে, রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক নির্ণয় সম্ভব হবে এবং রোগীর জীবনমান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।
আলঝেইমার সোসাইটি এর প্রধান নীতি ও গবেষণা কর্মকর্তা ফিওনা ক্যারাগার উল্লেখ করেন, “ব্রিটেনে এখনো এই ধরনের পরীক্ষার ব্যাপক প্রাপ্যতা নেই, ফলে সঠিক নির্ণয় করতে অনেক সময় লাগে। নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে, সময়মতো ও সঠিক নির্ণয় NHS এর জন্য অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।” তিনি জানান, সংস্থা এই রক্ত পরীক্ষার গবেষণায় আর্থিক সহায়তা প্রদান করছে, যাতে ভবিষ্যতে ডিমেনশিয়া রোগের দ্রুত সনাক্তকরণ সম্ভব হয়।
যদি এই আঙুলের রক্ত পরীক্ষা সফল হয়, তবে আলঝেইমার রোগের প্রাথমিক সনাক্তকরণে একটি বড় অগ্রগতি অর্জিত হবে। রোগীর পরিবার ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী উভয়ই দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারবে, এবং নতুন থেরাপি ও ওষুধের সুবিধা সময়মতো গ্রহণ করতে সক্ষম হবে। গবেষণাটি আগামী কয়েক বছর ধরে স্বেচ্ছাসেবকদের দীর্ঘমেয়াদী অনুসরণ করবে, যাতে রক্তের বায়োমার্কারের পরিবর্তন ও রোগের অগ্রগতি কীভাবে সম্পর্কিত তা বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা যায়।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায়ও যদি এ ধরনের সহজ ও সাশ্রয়ী রক্ত পরীক্ষা প্রয়োগ করা যায়, তবে ডিমেনশিয়া রোগের প্রাথমিক সনাক্তকরণে বড় সুবিধা হবে। রোগীর প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক নির্ণয় রোগের অগ্রগতি ধীর করতে এবং রোগীর পরিবারকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে সহায়তা করবে। আপনি কি মনে করেন, আমাদের দেশের স্বাস্থ্য নীতি কি এমন নতুন প্রযুক্তিকে দ্রুত গ্রহণের জন্য প্রস্তুত? আপনার মতামত শেয়ার করুন।



