লন্ডন ভিত্তিক হেলেন এবং তার স্বামী রিচার্ড, দুজনই যুক্তরাজ্যের নাগরিক, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাদের ক্রিপ্টো সম্পদের ওপর বিশাল চুরি ঘটার শিকার হন। হেলেনের ব্যক্তিগত সহায়ক হিসেবে কাজের পাশাপাশি রিচার্ড একজন সুরকার, দুজনেই সাত বছর ধরে কার্ডানো (Cardano) নামের ডিজিটাল মুদ্রা সংগ্রহ করে আসছেন। হেলেনের দাবি অনুযায়ী, চুরির ফলে তার প্রায় $৩১৫,০০০ (প্রায় £২৫০,০০০) সম্পদ হারিয়ে গেছে, যা তাদের মোট সম্পদের একটি বড় অংশ।
দম্পতি প্রথমে কার্ডানোকে উচ্চ সম্ভাবনাসম্পন্ন ডিজিটাল সম্পদ হিসেবে বেছে নেন, কারণ ঐ মুদ্রার মূল্য দ্রুত বাড়তে পারে এবং প্রচলিত সঞ্চয় পদ্ধতির তুলনায় বেশি রিটার্নের সম্ভাবনা থাকে। তারা জানতেন যে ক্রিপ্টোতে ঝুঁকি বেশি, তবু নিরাপদে কী সংরক্ষণ করার জন্য ক্লাউড স্টোরেজে তাদের ওয়ালেটের তথ্য এবং অ্যাক্সেস কী সংরক্ষণ করেন। এই পদ্ধতি তাদের জন্য স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ছিল, কারণ তারা নিয়মিতভাবে অতিরিক্ত তহবিল দিয়ে নতুন কয়েন কিনে থাকতেন।
কিন্তু ২০২৪ সালের শুরুর দিকে হ্যাকাররা তাদের ক্লাউড অ্যাকাউন্টে অনুপ্রবেশ করে। প্রথমে একটি ছোট পরিমাণ টোকেন স্থানান্তর করে সিস্টেমের দুর্বলতা পরীক্ষা করার পর, হ্যাকাররা দ্রুতই দম্পতির সব কার্ডানো কয়েন নিজেদের ডিজিটাল ওয়ালেটে স্থানান্তর করে। এই স্থানান্তরটি সম্পূর্ণ গোপনীয়ভাবে এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সম্পন্ন হয়, ফলে হেলেন এবং রিচার্ডের কোনো প্রতিক্রিয়া জানার সুযোগ না থাকে।
চুরি ঘটার পর দম্পতি কয়েক মাস ধরে তাদের ওয়ালেটের ব্যালেন্স শূন্য হয়ে যাওয়া দেখেন, যদিও ব্লকচেইনে সব লেনদেন স্পষ্টভাবে রেকর্ড থাকে। ব্লকচেইনের স্বচ্ছতা সত্ত্বেও, চোরদের পরিচয় এবং তাদের আর্থিক প্রবাহকে ট্রেস করা কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ ব্যবহারকারীরা গোপনীয়তা বজায় রাখতে বিভিন্ন টুল ব্যবহার করে থাকেন। এই বৈপরীত্যই হেলেনকে “একটি অদৃশ্য ফাঁদে ধরা” বলে বর্ণনা করতে উদ্বুদ্ধ করে।
হেলেন এবং রিচার্ডের আর্থিক অবস্থা সাধারণ মধ্যবিত্তের কাছাকাছি। হেলেনের কাজের বেতন এবং রিচার্ডের সঙ্গীত রচনার আয় দুজনের জন্য যথেষ্ট নয়, তাই তারা তাদের সঞ্চয় থেকে যতটা সম্ভব কার্ডানোতে বিনিয়োগ করতেন। রিচার্ডের মতে, বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর এই চুরি তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা। তিনি বলেন, “এতদিনের সঞ্চয় ও স্বপ্ন এক মুহূর্তে নিখুঁতভাবে নষ্ট হয়ে গেল।”
চুরির পর হেলেন দ্রুতই আইনগত পদক্ষেপ নিতে শুরু করেন। তিনি বিভিন্ন পুলিশ বিভাগ এবং কার্ডানো নেটওয়ার্কের ডেভেলপারদের কাছ থেকে বিশদ রিপোর্ট সংগ্রহ করেন। এই রিপোর্টগুলোতে চোরের ওয়ালেট ঠিকানা এবং লেনদেনের ধারাবাহিকতা উল্লেখ রয়েছে, যা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করছে। হেলেন এখনো চোরের ওয়ালেটের ঠিকানা জানেন, তবে তা থেকে সরাসরি অর্থ পুনরুদ্ধার করা বর্তমানে সম্ভব নয়।
ব্রিটিশ আইন অনুসারে, ক্রিপ্টো সম্পদের চুরি একটি সাইবার অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হবে। বর্তমানে পুলিশ চোরের আর্থিক প্রবাহ অনুসরণ করে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সম্ভাব্য স্থানে সম্পদ আটক করার চেষ্টা করছে। দম্পতি দাবি করেন, তারা ভবিষ্যতে আদালতে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে চান, যাতে একই ধরনের অপরাধের শিকারদের জন্য রায়ের ভিত্তি তৈরি হয়।
এই ঘটনা ক্রিপ্টো বাজারে নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা পুনরায় উন্মোচিত করেছে। যদিও ব্লকচেইন প্রযুক্তি লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে, ব্যবহারকারীর কী সংরক্ষণ এবং অ্যাক্সেস নিয়ন্ত্রণে ত্রুটি থাকলে সম্পদ হারানোর ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, গুরুত্বপূর্ণ কী গুলো অফলাইন হার্ডওয়্যারে সংরক্ষণ করা এবং ক্লাউড স্টোরেজের অতিরিক্ত নিরাপত্তা স্তর যোগ করা উচিত।
হেলেনের পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টা এখনও চলমান, এবং তিনি আশাবাদী যে আইনগত প্রক্রিয়া এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে কিছু না কিছু ফেরত পাওয়া সম্ভব হবে। তবে তিনি স্বীকার করেন, “ব্লকচেইনে টাকা দেখা যায়, কিন্তু তা ফিরে পাওয়া কঠিন।” এই কথাটি ক্রিপ্টো ব্যবহারকারীদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।
সারসংক্ষেপে, হেলেন ও রিচার্ডের কার্ডানো চুরি একটি বড় আর্থিক ক্ষতি এবং মানসিক আঘাতের উদাহরণ। চোরের পরিচয় এখনও অজানা, তবে তদন্তের অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ভবিষ্যতে অনুরূপ অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।



