অ্যানিমেশন জগতের বিশিষ্ট পরিচালক রজার অলার্স, ৭৬ বছর বয়সে, শনিবার ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা মনিকায় নিজের বাড়িতে সংক্ষিপ্ত অসুস্থতার পর নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যু সংবাদটি ডিজনি অ্যানিমেশন অফিসের মাধ্যমে জানানো হয়। অলার্সের মৃত্যু চলচ্চিত্র ও থিয়েটার শিল্পে বড় ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
১৯৪৯ সালের ২৯ জুন, নিউ ইয়র্কের রাই শহরে জন্ম নেওয়া অলার্স ছোটবেলা থেকেই অ্যানিমেশনের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। তিনি আরিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ফাইন আর্টসের ডিগ্রি অর্জন করেন এবং সেখানেই তার শিল্পী দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে। শিক্ষাকালীন সময়ে তিনি অ্যানিমেশন শিল্পের মৌলিক নীতি শিখে ভবিষ্যতে বড় স্বপ্ন দেখেন।
ডিজনি অ্যানিমেশনে তার প্রথম বড় কাজ ছিল ১৯৮২ সালের ‘ট্রন’, যেখানে তিনি সিজিআই প্রযুক্তির ব্যবহারকে ব্যাপকভাবে প্রসারিত করতে সহায়তা করেন। এই চলচ্চিত্রটি সিজিআই ব্যবহার করে তৈরি প্রথম বড় পর্দার ছবি হিসেবে ইতিহাসে স্থান পায়। এরপর তিনি ‘দ্য লিটল মারমেড’, ‘বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট’, ‘আলাদিন’ এবং ‘ওলিভার অ্যান্ড কোম্পানি’ সহ বেশ কয়েকটি সফল ডিজনি অ্যানিমেটেড ফিচারে কাজ করেন।
১৯৯৪ সালে ‘দ্য লায়ন কিং’ ছবির সহ-নির্দেশক হিসেবে অলার্সের নাম শীর্ষে উঠে আসে। রব মিনকফের সঙ্গে মিলিত হয়ে তিনি এই চলচ্চিত্রের সৃজনশীল দিক পরিচালনা করেন, যা বিশ্বব্যাপী প্রায় ৯৭৯ মিলিয়ন ডলার আয় করে ১৯৯৪ সালের সর্বোচ্চ আয়কারী চলচ্চিত্রের খেতাব অর্জন করে। এই সাফল্য অ্যানিমেশন শিল্পে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করে এবং বহু দর্শকের হৃদয়ে অম্লান ছাপ রেখে যায়।
‘দ্য লায়ন কিং’ ছাড়াও অলার্স ‘দ্য রেসকিউয়ার্স ডাউন অন্ডার’, ‘দ্য লিটল মারমেড’ এবং ‘বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট’ মতো ক্লাসিক ছবিগুলোর স্ক্রিপ্ট ও স্টোরিবোর্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার কাজের মাধ্যমে এই চলচ্চিত্রগুলোতে চরিত্রের গভীরতা, সঙ্গীতের সমন্বয় এবং আবেগময় গল্পের গঠন সুদৃঢ় হয়।
ট্রনের সিজিআই অভিজ্ঞতা তার পরবর্তী প্রকল্পগুলিতে প্রযুক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করে। তিনি অ্যানিমেশনে কম্পিউটার গ্রাফিক্সের ব্যবহারকে আরও উন্নত করার জন্য গবেষণা ও বিকাশে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন, যা পরবর্তীতে ডিজনির ভবিষ্যৎ প্রকল্পগুলোর ভিত্তি গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
‘দ্য লায়ন কিং’ মঞ্চে রূপান্তরিত করার সময় অলার্স ইরিনে মেচি সঙ্গে সহযোগিতা করে নাট্যরূপে রূপান্তরিত স্ক্রিপ্ট রচনা করেন। এই কাজের জন্য তিনি ১৯৯৮ সালে টনি পুরস্কারের ‘সেরা মিউজিক্যাল বই’ বিভাগে মনোনীত হন। থিয়েটার জগতে তার এই অবদান অ্যানিমেশনকে মঞ্চ শিল্পের সঙ্গে সংযুক্ত করার নতুন পথ খুলে দেয়।
২০০৬ সালে তিনি সনি স্টুডিওর ‘ওপেন সিজন’ অ্যানিমেটেড ছবির সহ-নির্দেশনা গ্রহণ করেন, যা তার ক্যারিয়ারের বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করে। এই চলচ্চিত্রটি বন্যপ্রাণীর চরিত্র ও হাস্যরসের মাধ্যমে পরিবারিক দর্শকদের মন জয় করে।
অলার্সের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি একাধিক অস্কার এবং টনি নোমিনেশন পেয়েছেন। যদিও তিনি কোনো পুরস্কার জিততে পারেননি, তবে তার সৃষ্টিশীল দৃষ্টিভঙ্গি ও গল্প বলার ক্ষমতা শিল্পের বহু তরুণকে অনুপ্রাণিত করেছে।
ডিজনি সিইও বব ইগার অলার্সের মৃত্যুর পর একটি বিবৃতি প্রকাশ করে বলেন, তিনি একটি সৃজনশীল দৃষ্টান্ত ছিলেন, যার অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অমূল্য। তিনি গল্পের শক্তি, চরিত্রের গভীরতা এবং সঙ্গীতের সমন্বয়কে কীভাবে চিরন্তন করে তোলেন তা বুঝতে পারতেন। তার কাজ অ্যানিমেশন যুগকে সংজ্ঞায়িত করেছে এবং বিশ্বব্যাপী দর্শকদের অনুপ্রাণিত করে চলেছে।
রজার অলার্সের পরিবার, বন্ধু এবং সহকর্মীরা এই কঠিন সময়ে শোক প্রকাশ করছেন। তার সৃষ্টিগুলো ভবিষ্যতে নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে, এবং অ্যানিমেশন শিল্পে তার ছাপ কখনো ম্লান হবে না।



