ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) গ্রীনল্যান্ড সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক হুমকির মোকাবিলায় আগামী দিনগুলোতে জরুরি শীর্ষসভা করবে। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, ডেনমার্কের ভূখণ্ডিক অখণ্ডতা রক্ষা করা দেশগুলোকে অর্থনৈতিক শাস্তি দেওয়া হবে, যা ইইউকে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে ফেলেছে। এই পরিস্থিতি ইইউকে তার প্রথমবারের মতো “ট্রেড বেজুকা” ব্যবহার করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
ইইউ নেতারা ব্রাসেলসে একত্রিত হয়ে ট্রাম্পের হুমকির প্রকৃত প্রভাব বিশ্লেষণ করবেন এবং সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নির্ধারণের জন্য আলোচনা চালাবে। শীর্ষসভার মূল লক্ষ্য হল ট্রাম্পের শুল্ক হুমকির বিরুদ্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যায় তা নির্ধারণ করা, যাতে ইউরোপীয় বাজারের স্বার্থ রক্ষা করা যায়। একই সঙ্গে, ইইউকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সংঘর্ষের ঝুঁকি কমাতে কূটনৈতিক পথও অনুসন্ধান করতে হবে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন এই মুহূর্তে ইইউকে তার “অ্যান্টি-কোর্সন ইনস্ট্রুমেন্ট” (ACI) সক্রিয় করতে আহ্বান জানিয়েছেন। ACI হল একটি আইনি কাঠামো, যা কোনো বহিরাগত শক্তি দ্বারা ইউরোপীয় বাজারে অনধিকার হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে। পূর্বে এই ব্যবস্থা চীনকে লক্ষ্য করে গৃহীত হয়েছিল, তবে এখন ট্রাম্পের হুমকির মুখে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হতে পারে।
ACI সক্রিয় হলে ইইউ সদস্য দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের উপর প্রতিশোধমূলক শুল্ক আরোপ, একক বাজারে প্রবেশ সীমাবদ্ধ করা এবং ইউরোপীয় চুক্তি ও প্রকল্পে অংশগ্রহণে বাধা দেওয়ার অনুমতি দেবে। এই ধরনের পদক্ষেপ ইইউকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে রাখবে, তবে একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াবে।
ইইউ-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ঐতিহাসিক ভিত্তি বিবেচনা করলে, উভয় পক্ষেরই পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে। তবে ট্রাম্পের গ্রীনল্যান্ডের অধিগ্রহণের ইচ্ছা—যা কিনে নেওয়া হোক বা সামরিকভাবে—ইইউকে তার কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে। যদি ইইউ কোনো পদক্ষেপ না নেয়, তবে ট্রাম্প ইইউকে দুর্বল ও বিভক্ত হিসেবে দেখার সম্ভাবনা বাড়বে।
ইইউ-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, ইইউ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মতবিরোধও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জিওর্জিয়া মেলোনি, যিনি ট্রাম্পের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে ভাল সম্পর্ক বজায় রেখেছেন, তিনি ম্যাক্রনের কঠোর পদক্ষেপের বিরোধিতা প্রকাশ করেছেন। মেলোনি গ্রীনল্যান্ডে সামরিক উপস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি ঘটেছে বলে উল্লেখ করেন, তবে তিনি এই বিষয়টি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেননি।
মেলোনির মন্তব্য ইইউয়ের অভ্যন্তরে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা নির্দেশ করে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রতি সম্মান দেখিয়ে, গ্রীনল্যান্ডে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর পরিবর্তে সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান প্রস্তাব করেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি ইইউকে একতাবদ্ধ করে ট্রাম্পের হুমকির মুখে সমন্বিত কৌশল গড়ে তুলতে সহায়তা করতে পারে।
ইইউ-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, ইইউকে তার অভ্যন্তরীণ ঐক্য বজায় রাখতে হবে। শীর্ষসভার পরে, ইইউ রাষ্ট্রীয় প্রধানমন্ত্রীরা একত্রিত হয়ে ACI ব্যবহার করে কী ধরনের শুল্ক আরোপ করা যায় তা নির্ধারণের জন্য কাজ করবে। একই সঙ্গে, ইইউ সদস্য দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খোঁজার নির্দেশনা দেওয়া হবে।
ইইউয়ের জরুরি শীর্ষসভা ব্রাসেলসে ইইউ রায়নায়কদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হবে। রায়নায়করা ট্রাম্পের হুমকির প্রভাব মূল্যায়ন করে, ইইউয়ের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। শীর্ষসভার ফলাফল ইইউকে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক নীতি নির্ধারণে দিকনির্দেশনা দেবে।
ইইউয়ের এই পদক্ষেপের ফলে, ইউরোপীয় বাজারের স্বার্থ রক্ষা করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সংঘাত এড়ানোর মধ্যে একটি সূক্ষ্ম সমতা বজায় রাখতে হবে। যদি ইইউ ACI সক্রিয় করে শুল্ক আরোপ করে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষতি হতে পারে, তবে ইউরোপীয় শিল্প ও কৃষি খাতের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে।
অন্যদিকে, যদি ইইউ কোনো পদক্ষেপ না নেয়, তবে ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী গ্রীনল্যান্ডের অধিগ্রহণের সম্ভাবনা বাড়বে, যা ইউরোপীয় নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে, ইইউকে কূটনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রীনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করার জন্য প্ররোচিত করতে হবে।
সারসংক্ষেপে, ইইউ গ্রীনল্যান্ডের ওপর ট্রাম্পের শুল্ক হুমকির প্রতিক্রিয়ায় জরুরি শীর্ষসভা আয়োজন করেছে, যেখানে ACI ব্যবহার করে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হবে। ইইউ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মতবিরোধের সত্ত্বেও, একতাবদ্ধ কূটনৈতিক কৌশল গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। শীর্ষসভার ফলাফল ইইউকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।



