ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেটান্যাহু শনি দিন তার শীর্ষ উপদেষ্টাদের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠক করেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা “শান্তি বোর্ড” পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে জানানো হয় যে, ট্রাম্পের ২০‑পয়েন্টের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গাজা পুনর্গঠন ও সাময়িক প্রশাসন পরিচালনার জন্য গঠিত এই বোর্ডে ইসরায়েলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, যা নেটান্যাহু সরকারের মতে সমন্বয়হীন এবং দেশের নীতির বিরোধী।
এই ঘোষণার পর, ট্রাম্পের দল গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ডের তালিকা প্রকাশ করে। এতে তুর্কি পররাষ্ট্র মন্ত্রী, কাতারী কর্মকর্তা, প্রাক্তন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের নাম অন্তর্ভুক্ত। বোর্ডের কাজ গাজা অঞ্চলের সাময়িক শাসন ও পুনর্নির্মাণ তদারকি করা, তবে এর সুনির্দিষ্ট কাঠামো ও সদস্য তালিকা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
শান্তি বোর্ডের অধীনে দুটি উচ্চপদস্থ সংস্থা গঠন করা হয়েছে। প্রথমটি “প্রতিষ্ঠাতা এক্সিকিউটিভ বোর্ড”, যা মূলত বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সম্পর্কের উপর কেন্দ্রীভূত। দ্বিতীয়টি “গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ড”, যা গাজা প্রশাসন সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি (NCAG) এর মাঠ কাজের তদারকি করবে। বর্তমানে গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ডে একমাত্র ইসরায়েলি সদস্য হলেন ইয়াকির গাবায়, যিনি ইসরায়েলে জন্মগ্রহণ করে বর্তমানে সাইপ্রাসে বসবাসকারী ব্যবসায়ী। উভয় বোর্ডেই কোনো ফিলিস্তিনি সদস্য অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
ইসরায়েলের ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এই উদ্যোগের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি সামাজিক মাধ্যম X-এ লিখে জানান, গাজা অঞ্চলে কোনো “প্রশাসনিক কমিটি” প্রয়োজন নেই; বরং হামাসের সন্ত্রাসীদের নির্মূল করা জরুরি। একই সময়ে বিরোধী দলীয় নেতা ইয়ায়ার লাপিদ এই ঘোষণাকে “ইসরায়েলের জন্য কূটনৈতিক ব্যর্থতা” বলে সমালোচনা করেন। উভয় নেতার মন্তব্য গাজা বিষয়ক আন্তর্জাতিক আলোচনায় ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে প্রকাশ করে।
কাতার ও তুরস্কের কর্মকর্তাদের এই পরামর্শক প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত হওয়া নিশ্চিত হয়েছে। উভয় দেশ গাজা অঞ্চলের ইসরায়েলি সামরিক কার্যক্রমের সমালোচনায় পূর্বে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। তাদের অংশগ্রহণ ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনায় মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান দেশগুলোর স্বীকৃতি ও সমর্থন পাওয়ার লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
শান্তি বোর্ডের সর্বোচ্চ স্তরে বিশ্ব নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে, যার চেয়ারম্যান হিসেবে ট্রাম্পের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও এখনো যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ইত্যাদি দেশের নেতাদের নাম প্রকাশিত হয়নি, তবে সাদা বাড়ি এই বিষয়ে নিশ্চিত করেছে যে, ভবিষ্যতে এই বোর্ডে বহু আন্তর্জাতিক নেতা অংশ নেবেন।
গাজা শান্তি বোর্ডের গঠন ও কার্যপ্রণালী এখনও অনিশ্চিত, তবে ইসরায়েলি সরকার ও বিরোধী গোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র মতবিরোধের সূচনা হয়েছে। নেটান্যাহু সরকারের দৃষ্টিতে, বোর্ডের মাধ্যমে গাজা পুনর্গঠন ও মানবিক সহায়তা দ্রুত চালু করা সম্ভব হবে, যা দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের সমাধানে সহায়তা করবে। অন্যদিকে, বেন-গভির মত কঠোর নিরাপত্তা-ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি গাজা অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসনকে প্রত্যাখ্যান করে, যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন যে, গাজা শান্তি বোর্ডের কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও আর্থিক সহায়তা পাওয়া গেলে, ইসরায়েল-হামাস সংঘাতের সমাপ্তি প্রক্রিয়ায় নতুন মোড় আসতে পারে। তবে, ফিলিস্তিনিদের প্রতিনিধিত্বের অভাব এবং ইসরায়েলি অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে, বোর্ডের কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতা এখনও প্রশ্নের মুখে। পরবর্তী সপ্তাহে ট্রাম্পের দল গাজা শাসন সংক্রান্ত আরও বিশদ পরিকল্পনা প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে, যা ইসরায়েলি সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গাজা শান্তি বোর্ডের ভবিষ্যৎ গঠন, সদস্য নির্বাচন এবং কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি সম্পর্কের পুনর্গঠন ও স্থিতিশীলতার জন্য মূল চাবিকাঠি হবে। এই প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন, গাজা বাসিন্দাদের স্বার্থ রক্ষা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একসঙ্গে পরিচালনা করা প্রয়োজন।



