১৮ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মোহাম্মদপুরে জুলাই ২০২৪-এ সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিবরণ উপস্থাপন করা হয়। ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ২৮ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়েরের পর শিকারের পরিবার ও জনসাধারণকে ঘটনাস্থলের তথ্য জানিয়ে দেন। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, পুলিশের চায়না রাইফেল থেকে গুলি সরাসরি এক কিশোরের কপাল ভেদ করে পেছন থেকে বেরিয়ে গিয়ে তার প্রাণ ত্যাগ করে।
মহাম্মদপুরের ঐ সংঘাতে নিহত কিশোরের নাম ছিল মাহমুদুর রহমান সৈকত, যিনি প্রায় ছয় ফুট উচ্চতার তরুণ ও প্রাণবন্ত ছিলেন। ১৯ জুলাই ২০২৪-এ তিনি মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ না করে আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়েছিলেন। একই সময়ে পুলিশের একটি দল চায়না রাইফেল ব্যবহার করে গুলিবর্ষণ শুরু করে, যার ফলে এক গুলি সরাসরি সৈকতের কপাল ভেদ করে পেছন দিক থেকে বেরিয়ে তার মৃত্যু ঘটায়।
সৈকতের মৃত্যুর পাশাপাশি, একই সময়ে ফারহান ফাইয়াজ নামের আরেক তরুণেরও গুলিবর্ষণে প্রাণ ত্যাগ করে। উভয় শিকারের মৃত্যু স্থানীয় ছাত্র-জনতার মধ্যে গভীর শোক ও রাগের সঞ্চার করে, যা আন্দোলনের তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়। ট্রাইব্যুনালের ব্রিফিংয়ে প্রসিকিউটর উল্লেখ করেন যে, এই দুই তরুণের মৃত্যুর পরপরই মোহাম্মদপুরে আরও বেশ কয়েকজন নিহত হন, যা পুরো এলাকাকে রক্তাক্ত করে তুলেছে।
মোহাম্মদপুরে ১৮ ও ১৯ জুলাই দুই দিনেই মোট নয়জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। শিকারের তালিকায় ফারহান ফাইয়াজ, মাহমুদুর রহমান সৈকত, রাজু আহমেদ, মাহিন, মোহাম্মদ রনি, আল শাহরিয়ার রোকন, ইসমাইল হোসেন, জসিম উদ্দীন এবং জুবাইদ হোসেন ইমন অন্তর্ভুক্ত। এই ঘটনাগুলি দেশের ইতিহাসের অন্যতম রক্তাক্ত দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে এবং মোহাম্মদপুরকে হত্যাকাণ্ডের হটস্পট হিসেবে গণ্য করা হয়।
প্রসিকিউটর জোর দিয়ে বলেন যে, জুলাই ২০২৪-এ সংঘটিত এই অপরাধের দায়ী সকলকে, যার মধ্যে সরাসরি গুলিবর্ষণকারী, রাস্তায় সরাসরি অংশগ্রহণকারী এবং পরিকল্পনাকারী বা ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিরা অন্তর্ভুক্ত, আইনের আওতায় আনতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন যে, তদন্ত সংস্থা ইতিমধ্যে অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রমাণ-দলিল সংগ্রহ করে আদালতে দাখিল করেছে এবং এই প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার প্রক্রিয়া চালু হবে।
ট্রাইব্যুনাল ২৮ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গ্রহণের পরপরই একটি সংবাদ ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে জনসাধারণকে ঘটনাবলী সম্পর্কে জানায়। এতে শিকারের পরিবারকে শোক প্রকাশের সুযোগ দেওয়া হয় এবং একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ বিচার প্রক্রিয়ার সময়সূচি ও দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপের তথ্য প্রদান করা হয়।
প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম জানান যে, অভিযোগ দায়েরের পরপরই তদন্ত সংস্থা অপরাধীদের বিরুদ্ধে বিস্তারিত প্রতিবেদন ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক দালিলিক প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করেছে। এই দালিলিক প্রমাণের ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনাল আগামী ২৯ জানুয়ারি পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করবে, যেখানে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় দেওয়া হবে।
মোহাম্মদপুরে ঘটিত এই হত্যাকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলি কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। শিকারের পরিবার ও সমাজের বিভিন্ন স্তরে এই ঘটনার নিন্দা প্রকাশ করা হয়েছে এবং ন্যায়বিচারের দাবি করা হয়েছে।
এই ঘটনার আইনি দিক থেকে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে এই ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ী ব্যক্তিরা সর্বোচ্চ শাস্তি পায়। ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সারসংক্ষেপে, জুলাই ২০২৪-এ মোহাম্মদপুরে গুলিবর্ষণ, গুলির মাধ্যমে কিশোরের মৃত্যু এবং মোট নয়জনের মৃত্যুর ঘটনা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে আইনি পর্যায়ে আনা হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটরের বিবরণে স্পষ্ট হয়েছে যে, তদন্ত সংস্থা ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংগ্রহ করেছে এবং শীঘ্রই আদালতে মামলার শোনানি হবে, যা শিকারের পরিবার ও সমাজের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা পূরণ করবে।



