জুলাই ২০২৩-এ শুরু হওয়া আন্দোলন ও তার পরবর্তী সময়ে গার্মেন্টসসহ বহু শিল্পখাতের কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এক বছর অর্ধেক কেটে গেলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু হয়নি। নতুন কোনো ব্যবসা ক্ষেত্র গড়ে ওঠেনি, ফলে দেশের বাণিজ্যিক পরিবেশ আরও জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনেক ব্যবসায়ী দেশ ছেড়ে গেছেন; তাদের বন্ধ কারখানাগুলো এখনো অচল অবস্থায় রয়েছে। দেশের ভিতরে থাকা উদ্যোক্তারা আইনি জটিলতা ও বিভিন্ন ধরনের হয়রানির মুখোমুখি, যা তাদের কার্যক্রমকে আরও বাধাগ্রস্ত করছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি, ডলারের অতিমূল্যায়নও উৎপাদন খরচকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে।
এই সব কারণ মিলিয়ে দেশের বাণিজ্যিক খাত এখনও কঠিন সময় অতিক্রম করছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কাছাকাছি আসলেও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর হয়নি; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। শীর্ষ নেতৃত্বের পরিবর্তন প্রত্যাশা সত্ত্বেও, বর্তমান রাজনৈতিক দৃশ্যপটের দ্রুত পরিবর্তন ব্যবসায়িক আত্মবিশ্বাসকে হ্রাস করেছে।
মোট অর্থনৈতিক গতি ধীরগতিতে চলছে। নতুন বিনিয়োগের প্রবাহ কমে যাওয়ায়, মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়ছে এবং রাজস্ব সংগ্রহে ধীরগতি দেখা দিচ্ছে। ব্যাংকিং খাতের অনিশ্চয়তা, ঋণের উচ্চ সুদ এবং বৈশ্বিক মন্দার প্রভাব একসাথে দেশের আর্থিক সংকটকে তীব্রতর করেছে। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, নির্বাচনের ফলাফল না জানার আগে এই অনিশ্চয়তা দূর করার কোনো সুযোগ নেই।
জাতিসংঘের শিল্প ও বাণিজ্য সংস্থা (UNCTAD) অনুযায়ী, বাংলাদেশ এই বছর ৪.৬ শতাংশ জিডিপি বৃদ্ধির সম্ভাবনা রাখে, যা গত বছরের তুলনায় সামান্য উন্নতি। পরবর্তী অর্থবছরে এই হার ৫.৪ শতাংশে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে। যদিও এই সংখ্যা ইতিবাচক, তবু বাস্তবিক অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার জন্য কাঠামোগত পদক্ষেপের প্রয়োজন।
বাণিজ্যিক দিক থেকে, বর্তমান আর্থিক বছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) ২৬টি দেশে গার্মেন্টস রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বড় বাজারে নেতিবাচক প্রবণতা নতুন মাত্রা গ্রহণ করেছে, যার ফলে রপ্তানি মূল্য ১ হাজার ৯৩৬ কোটি ৫৪ লাখ ডলারে নেমে এসেছে, যেখানে পূর্ববছরের একই সময়ে তা ছিল ১ হাজার ৯৮৮ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। গার্মেন্টসের পাশাপাশি শাকসবজি, মাছ, হিমায়িত খাবার ও অপ্রচলিত পণ্যের রপ্তানিও কমেছে।
এই রপ্তানি হ্রাসের মূল কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা হ্রাস, মুদ্রা রেটের অস্থিরতা এবং উৎপাদন খরচের বৃদ্ধি উল্লেখ করা হচ্ছে। রপ্তানি হ্রাসের ফলে বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমে যাওয়ায়, দেশের মুদ্রা রিজার্ভের উপরও চাপ বাড়ছে। ফলে রপ্তানি-নির্ভর শিল্পগুলোকে নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিচ্ছে।
দেশীয় বাজারেও ব্যবসার গতি ধীর হয়েছে। শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, ২০২৫ অর্থবছরটি মূলত টিকে থাকার লড়াই ছিল। উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাওয়া, কর্মী ঘাটতি এবং ঋণসঙ্কটের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান লাভজনকতা বজায় রাখতে পারছে না। এই পরিস্থিতি ছোট ও মাঝারি শিল্পখাতেও সমানভাবে প্রভাব ফেলছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর নতুন সরকার গঠিত হলে অর্থনৈতিক অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠার প্রত্যাশা বাড়ছে। তবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনশৃঙ্খলা ও নীতিগত ধারাবাহিকতা না থাকলে পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ধীর হতে পারে।
সংক্ষেপে, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের ব্যবসা-ব্যাপার বহু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। কারখানা বন্ধ, রপ্তানি হ্রাস, মুদ্রা ও ইউটিলিটি সংকট, এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা একসাথে দেশের অর্থনৈতিক গতি ধীর করে দিয়েছে। UNCTAD-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী জিডিপি বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকলেও, বাস্তবিক উন্নয়নের জন্য কাঠামোগত সংস্কার, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং রপ্তানি বাজারের বৈচিত্র্যকরণ জরুরি। ভবিষ্যতে যদি এই বিষয়গুলো সমাধান করা যায়, তবে দেশের বাণিজ্যিক পরিবেশ পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে।



