গ্রামীণফোনের সিইও ইয়াসির আজমানের মতে, করের বোঝা এবং দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক বিরোধের ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের টেলিকম সেক্টরে নতুন মূলধন ঢালতে অনিচ্ছুক। তিনি জানিয়েছেন, এই নেতিবাচক মনোভাব কেবল টেলিকম শিল্পেই নয়, অন্যান্য শিল্পখাতেও প্রভাব ফেলছে।
আজমান ৬ জানুয়ারি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপের সময় উল্লেখ করেন, দেশের বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের মাত্রা অত্যন্ত কমে গেছে, যা তার জন্য সর্বোচ্চ উদ্বেগের বিষয়। তিনি গ্রামীণফোনের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, মোবাইল অপারেটরদের সমিতি (এএমটিবি) এর সভাপতি হিসেবে অন্যান্য অপারেটরদের ক্ষেত্রেও একই ধরণের অনিশ্চয়তা লক্ষ্য করছেন।
গ্রামীণফোনের ২৮ বছরের কার্যক্রমের মধ্যে একটিও বছর নেই যখন অডিট সংক্রান্ত আপত্তিগুলি সম্পূর্ণভাবে সমাধান হয়েছে। দেশের তিনটি প্রধান মোবাইল অপারেটরের শেয়ারধারী মূলত বিদেশি প্রতিষ্ঠান, তাই এই অমীমাংসিত বিষয়গুলো তাদের অতিরিক্ত বিনিয়োগের ইচ্ছাকে দমন করে।
অন্যদিকে, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডিএ) এর চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী ১৫ জানুয়ারি ফেসবুকে পোস্টে জানিয়েছেন, ২০২৫ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য ও ব্যাংকিং সেক্টরে সবচেয়ে বেশি বিদেশি মূলধন প্রবাহিত হয়েছে, যার প্রধান উৎস চীন ও সিঙ্গাপুর। ইকুইটি, পুনঃবিনিয়োগিত আয় এবং আন্তঃকোম্পানি ঋণসহ সব ধরনের আর্থিক প্রবাহে বৃদ্ধি দেখা গেছে। চৌধুরী আরও উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক অশান্তি পরবর্তী বছরে সাধারণত বিদেশি বিনিয়োগে হ্রাস দেখা যায়, তবে বর্তমান পরিসংখ্যান তা থেকে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে।
আর্থিক বিরোধের সমাধান হিসেবে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে যাওয়াকে আজমান একটি সম্ভাব্য পথ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে দেশের দায়িত্ব হল বিনিয়োগ আকর্ষণ করা, নতুবা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যাহত হবে। গ্রামীণফোনের ওপর বর্তমানে প্রায় ১২,৫০০ কোটি টাকার অনিষ্পন্ন আর্থিক বিরোধের বোঝা রয়েছে, যা সমাধান না হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা হ্রাস পাবে।
রোবি এবং বাংলালিংকও একই ধরনের অডিট সমস্যার সম্মুখীন, যা সমাধান না হলে টেলিকম সেক্টরের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আজমানের মতে, অডিট প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিয়মিততা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে বিদেশি মূলধন প্রবাহে বাধা না আসে।
সারসংক্ষেপে, টেলিকম শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগের হ্রাসের মূল কারণ হিসেবে করের উচ্চ বোঝা এবং দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক বিরোধ চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে, বিডিএয়ের তথ্য দেখায় যে দেশের অন্যান্য সেক্টরে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবণতা ইতিবাচক, বিশেষ করে চীন ও সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে। এই দ্বৈত প্রবণতা সরকারকে টেলিকম সেক্টরের নিয়ন্ত্রক ও আর্থিক কাঠামো পুনর্বিবেচনা করতে উদ্বুদ্ধ করবে, যাতে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হয় এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে অবদান রাখে।
ভবিষ্যতে, আন্তর্জাতিক সালিশি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিদ্যমান বিরোধের সমাধান এবং অডিটের স্বচ্ছতা বাড়ানো টেলিকম সেক্টরে বিদেশি মূলধনের প্রবাহ পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। একই সঙ্গে, সরকারকে কর নীতি ও আর্থিক নিয়মাবলী সহজতর করে বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে।



