মূত্রে রক্তের উপস্থিতি প্রায়শই মূত্রাশয় ক্যান্সারের প্রাথমিক সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, রঙদৃষ্টিহীন (কালার ব্লাইন্ড) ব্যক্তিরা এই লক্ষণটি সহজে শনাক্ত করতে পারে না, ফলে রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে সনাক্তকরণে বিলম্ব ঘটতে পারে।
গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক মেডিকেল কেন্দ্রের ডেটা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, রঙদৃষ্টিহীন পুরুষদের মধ্যে মূত্রে রক্তের উপস্থিতি সনাক্ত করার হার স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন পুরুষদের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কম। একই প্রবণতা নারীদের ক্ষেত্রেও পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে, যদিও রঙদৃষ্টিহীনতার হার নারীদের মধ্যে কম।
মূত্রাশয় ক্যান্সার বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর প্রায় ৫ লক্ষ নতুন রোগীর মধ্যে দেখা যায়, এবং এর মৃত্যুহার প্রায় ১.৭ লক্ষ। রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে সনাক্তকরণ রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। তাই মূত্রে রক্তের উপস্থিতি দ্রুত শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রঙদৃষ্টিহীনতা মূলত লাল-সবুজ রঙের পার্থক্য শনাক্ত করতে অসুবিধা সৃষ্টি করে। মূত্রের রঙে সূক্ষ্ম লালচে দাগ দেখা গেলে তা রক্তের উপস্থিতি নির্দেশ করতে পারে, কিন্তু রঙদৃষ্টিহীন ব্যক্তিরা এই সূক্ষ্ম পরিবর্তনটি মিস করতে পারেন। গবেষকরা উল্লেখ করেছেন, রঙদৃষ্টিহীন রোগীরা প্রায়ই মূত্রের স্বাভাবিক হলুদ রঙকে রক্তের উপস্থিতি হিসেবে ভুলে যায়, অথবা রঙের পরিবর্তনকে অল্প সময়ের জন্যই উপেক্ষা করে।
এই গবেষণার ফলাফল থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে রঙদৃষ্টিহীন রোগীদের জন্য অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন। বিশেষ করে যারা ধূমপান, রসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শে থাকা বা পরিবারে মূত্রাশয় ক্যান্সারের ইতিহাস আছে, তাদের নিয়মিত স্ক্রিনিং করানো উচিত। ইউরিনাল সাইটোলজি বা সিটি স্ক্যানের মতো পরীক্ষার মাধ্যমে রক্তের উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়, যা রঙদৃষ্টিহীনতার কারণে সৃষ্ট ভুল শনাক্তকরণকে কমিয়ে দেয়।
ডাক্তারেরা রঙদৃষ্টিহীন রোগীদের জন্য মূত্রের রঙের পরিবর্তনের পাশাপাশি অন্যান্য লক্ষণগুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। যেমন মূত্রত্যাগের সময় জ্বালা, ঘন ঘন মূত্রত্যাগ, পিঠে ব্যথা বা ওজন হ্রাস। এই উপসর্গগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা পরামর্শ নেওয়া উচিত।
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে রঙদৃষ্টিহীনতা সাধারণত পুরুষদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, প্রায় ৮ থেকে ১২ শতাংশ পুরুষ রঙদৃষ্টিহীন। যদিও এই সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম, তবুও জনসংখ্যার বড় অংশকে প্রভাবিত করতে পারে, বিশেষ করে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মূত্রাশয় ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। তাই রঙদৃষ্টিহীন রোগীদের জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি।
স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো এখন রঙদৃষ্টিহীন রোগীদের জন্য বিশেষ নির্দেশিকা তৈরি করার পরিকল্পনা করছে। এতে মূত্রের রঙের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করার পরিবর্তে নিয়মিত ইউরিনাল টেস্টের মাধ্যমে রক্তের উপস্থিতি যাচাই করার সুপারিশ থাকবে। এছাড়া, রঙদৃষ্টিহীনতা নির্ণয় করা রোগীদেরকে তাদের পরিবারিক ডাক্তারকে এই তথ্য জানিয়ে অতিরিক্ত স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা নিতে বলা হবে।
সারসংক্ষেপে, মূত্রাশয় ক্যান্সারের প্রাথমিক সতর্ক সংকেত রঙদৃষ্টিহীন রোগীদের জন্য অদৃশ্য হতে পারে, যা রোগের অগ্রগতি দ্রুত করতে পারে। তাই রঙদৃষ্টিহীনতা থাকা ব্যক্তিদের উচিত নিয়মিত ইউরিনাল পরীক্ষা করা এবং অন্যান্য উপসর্গের প্রতি সতর্ক থাকা। আপনার যদি রঙদৃষ্টিহীনতা থাকে বা মূত্রের রঙে কোনো অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেন, তবে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
আপনার স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য নিয়মিত চেক-আপ এবং সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়া সবচেয়ে কার্যকর উপায়। আপনি কি আপনার রঙদৃষ্টিহীনতা সম্পর্কে জানেন? আপনার অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করিয়ে নিন।



