রবিবার বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিটে কাতার এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে ৩৫ জন বাংলাদেশি শ্রমিক হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। তারা রাশিয়া থেকে প্রত্যাহার করা হয় এবং কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়া চাকরিচ্যুত বলে জানানো হয়। এদের মধ্যে গাইবান্ধার মশিয়ুর রহমান, মানিকগঞ্জের আসমত আলী, ময়মনসিংহের হাইয়ুল মিয়া, সিরাজগঞ্জের আজাদুল হক, ঢাকার প্রসেনজিৎ রাজবংশী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের মো. আব্দুল্লাহসহ আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান জানান, প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক ও সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি সংস্থার সমন্বয়ে ফেরত আসা শ্রমিকদের বিমানবন্দরে পরিবহন এবং জরুরি সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এ ধরনের সমন্বয় দুই দেশের কূটনৈতিক সংলাপের ফল, যেখানে বাংলাদেশি শ্রমিকের অধিকার রক্ষা এবং রাশিয়ার শ্রম নীতি অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে।
শ্রমিকদের অভিযোগ অনুযায়ী, নিয়োগকারী সংস্থা কোনো স্পষ্ট কারণ না দিয়ে তাদের চাকরি বাতিল করে দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ধরনের হঠাৎ পদক্ষেপ শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা ও আর্থিক স্থিতিশীলতায় বড় প্রভাব ফেলেছে। একই সময়ে, রাশিয়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশি শ্রমিকদের ওপর কঠোর নিয়ম আরোপ করেছে, বিশেষত ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে আর্থিক ও কূটনৈতিক চাপ বাড়ার পর।
বাংলাদেশ সরকার রাশিয়ার সঙ্গে সমন্বয় করে এই শ্রমিকদের নিরাপদে দেশে ফেরত আনার ব্যবস্থা করেছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর, শ্রমিকদের যথাযথ পরিচর্যা এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রদান করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি সংস্থার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, যা আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
এই প্রথম পর্যায়ে ৩৫ জন শ্রমিকের ফেরত আসা মোট ১২০ জনের মধ্যে প্রথম দফা হিসেবে গণ্য। সরকার ইতিমধ্যে বাকি শ্রমিকদের জন্য একই প্রক্রিয়া চালু করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। এ ধরনের পুনর্বাসন কর্মসূচি বাংলাদেশি শ্রমিকের আন্তর্জাতিক বাজারে অবস্থান ও অধিকার রক্ষার লক্ষ্যে গৃহীত হয়েছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, রাশিয়ার শ্রম নীতি পরিবর্তন আন্তর্জাতিক শ্রম বাজারে নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। বিশেষত বাংলাদেশি শ্রমিকের জন্য রাশিয়া একটি বড় গন্তব্য, যেখানে নির্মাণ, গৃহস্থালী কাজ এবং সেবা খাতে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ নীতি পরিবর্তন এই চাহিদাকে প্রভাবিত করছে।
বাংলাদেশের শ্রম মন্ত্রণালয় রাশিয়ার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার জন্য নীতি নির্ধারণে কাজ করছে। এই আলোচনার অংশ হিসেবে, রাশিয়া থেকে প্রত্যাহারকৃত শ্রমিকদের পুনর্বাসন ও পুনঃপ্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়া থেকে প্রত্যাহারকৃত শ্রমিকদের বেশিরভাগই নিম্ন-দক্ষতা ভিত্তিক কাজের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত ছিলেন। তাদের প্রত্যাহার কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে এবং পরিবারিক আয়ের উপর প্রভাব ফেলেছে। সরকার এই শ্রমিকদের জন্য পুনরায় প্রশিক্ষণ ও স্থানীয় কর্মসংস্থান সুযোগ সৃষ্টির পরিকল্পনা চালু করেছে।
কাতার এয়ারওয়েজের ফ্লাইটটি আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের নিয়ম মেনে পরিচালিত হয় এবং বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিরাপদে দেশে পৌঁছানোর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর, শ্রমিকদের পরিচয় যাচাই এবং প্রয়োজনীয় কাস্টমস প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক শ্রমিক নীতি ও কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রাশিয়া ও বাংলাদেশ উভয়ই শ্রমিকের অধিকার রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ভবিষ্যতে, উভয় দেশই শ্রমিকের নিরাপত্তা, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং বৈধ চুক্তি নিশ্চিত করার জন্য আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয় বজায় রাখবে।
সারসংক্ষেপে, রাশিয়া থেকে ৩৫ জন বাংলাদেশি শ্রমিকের চাকরিচ্যুতি এবং দেশে ফেরত আসা একটি বৃহত্তর পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার অংশ, যেখানে কূটনৈতিক সমন্বয়, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং শ্রমিকের অধিকার রক্ষার জন্য বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টা দেখা যায়। এই প্রক্রিয়া দেশের আন্তর্জাতিক শ্রমিক নীতি ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের দৃঢ়তা বাড়াতে সহায়ক হবে।



