যুক্তরাজ্য ৩১ জানুয়ারি ২০২০-এ আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের পর, লেবার পার্টির নতুন সরকার ইইউ‑সাথে সম্পর্ক পুনরায় গড়ে তোলার জন্য আইনসভার পথে অগ্রসর হচ্ছে। লেবার পার্টির অধিকাংশে পার্লামেন্টের সমর্থন সত্ত্বেও, সরকারকে ডানপন্থী দলগুলোর তীব্র বিরোধের মুখোমুখি হতে হবে।
ব্রেক্সিটের পর দশকের বেশি সময়ে যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক আলোচনায় ইউরোপীয় সংযোগের বিষয়টি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে, চৌদ্দ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা কনজারভেটিভ পার্টি হারে, এবং লেবার পার্টির নেতা কিয়ার স্টারমার প্রধানমন্ত্রিত্বে আসেন।
নতুন সরকার গঠন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্টারমার ইউরোপীয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ শুরু করেন। তিনি দাবি করেন, ইইউ‑সাথে পুনরায় সংযোগ ব্রিটেনের স্থবির অর্থনীতিতে নতুন গতিশক্তি যোগাবে এবং জনমতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ফরাসি সংবাদ সংস্থা এএফপির তথ্য অনুযায়ী, লেবার সরকার ইইউ‑সাথে সম্পর্ক “রিসেট” করার জন্য একটি আইন প্রণয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই বিলটি ইইউ‑এর নিয়মাবলীর সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো তৈরি করবে এবং পার্লামেন্টকে নতুন নিয়ম গ্রহণের ক্ষমতা দেবে।
লেবার পার্টির পার্লামেন্টে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও, ডানপন্থী বিরোধী দলগুলো এই উদ্যোগকে কঠোরভাবে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। কনজারভেটিভ পার্টি এবং রিফর্ম ইউকে, যারা ব্রেক্সিটের সময় ইইউ থেকে যুক্তরাজ্যকে বের করার পক্ষে কাজ করেছিল, তারা নতুন আইনকে “ব্রেক্সিটের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা” বলে সমালোচনা করতে পারে।
কনজারভেটিভ পার্টির নেতা, কঠোর ইউরো‑সন্দেহবাদী নাইজেল ফারাজ, স্টারমারের পদক্ষেপকে ইইউ‑এর প্রতি অবিশ্বাসের অভিযোগ উত্থাপন করতে পারেন। সরকারী সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ফারাজের এই মন্তব্যের পরেও সরকার আইন প্রণয়নের পথে অটল রয়েছে।
লেবার পার্টির অভ্যন্তরে এই বিষয়টি নিয়ে মতবিরোধের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে, পার্টির কিছু সদস্য উদ্বেগ প্রকাশ করছেন যে, ইইউ কাস্টমস ইউনিয়নে পুনরায় প্রবেশের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা হতে পারে কিনা। এই প্রশ্নটি পার্টির ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যের দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ।
গত বছর স্টারমার ইইউ নেতাদের সঙ্গে একটি বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল খাদ্য ও কৃষি পণ্যের রপ্তানিতে জটিলতা কমিয়ে বাণিজ্যিক প্রবাহ বাড়ানো। চুক্তির মাধ্যমে উভয় পক্ষই রপ্তানি-আমদানি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হয়।
এর পাশাপাশি, উভয় পক্ষ একটি বিদ্যুৎ চুক্তি নিয়ে আলোচনা করে সম্মত হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যকে ইইউয়ের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে, যা জ্বালানি খরচ কমাতে এবং গ্রিডের স্থিতিশীলতা বাড়াতে সহায়তা করবে। চুক্তিটি ইইউয়ের নিয়মাবলীর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু ক্ষেত্রেও যুক্তরাজ্যের মানদণ্ডকে সমন্বয় করবে।
বিলটি এখনো প্রকাশিত হয়নি, এবং সরকারী কর্মকর্তারা এর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক। তবে তারা জানিয়েছেন, এই আইনটি ইইউ‑এর নিয়মাবলীর সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখার জন্য একটি “ব্যবস্থাপনা কাঠামো” সরবরাহ করবে। এতে পার্লামেন্টকে নতুন নিয়ম গ্রহণের অনুমতি এবং প্রয়োজনীয় তদারকি ক্ষমতা প্রদান করা হবে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, যদি এই আইনটি পার্লামেন্টের অনুমোদন পায়, তবে যুক্তরাজ্য ইইউ‑এর বাজারে পুনরায় প্রবেশের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে। তবে তা বাস্তবায়নের জন্য কনজারভেটিভ ও রিফর্ম ইউকের কঠোর বিরোধিতা অতিক্রম করা প্রয়োজন হবে, এবং লেবার পার্টির অভ্যন্তরীণ ঐক্য বজায় রাখাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সারসংক্ষেপে, লেবার সরকার ইইউ‑সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য আইনগত কাঠামো তৈরি করতে উদ্যোগী, যা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা উভয়েরই লক্ষ্য পূরণে সহায়তা করতে পারে। তবে এই প্রক্রিয়ায় পার্লামেন্টের রাজনৈতিক গতি, বিরোধী দলের প্রতিরোধ এবং পার্টির অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের প্রভাবকে অগ্রাহ্য করা যাবে না।



