রোববার, ১৮ জানুয়ারি, ঢাকার মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে দুই দিনব্যাপী একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন শুরু হয়, যার মূল লক্ষ্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানো। এই ইভেন্টে দেশীয় ও বিদেশি গবেষক, নীতিনির্ধারক এবং সামাজিক উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা একত্রিত হয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন।
সম্মেলনের উদ্বোধনী সেশনে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের গবেষণা পরিচালক ড. মুনশী সুলায়মান উল্লেখ করেন যে, প্রতিবন্ধী জনগণকে দারিদ্র্য ও ভাতা নির্ভরতার চক্র থেকে বের করে আনা জরুরি, এবং তাদেরকে উৎপাদনশীল কাজের সঙ্গে যুক্ত করা সময়ের দাবি।
লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক ড. মরগান ব্যাংকসও একই মঞ্চে উপস্থিত হয়ে বলেন, উন্নয়নশীল দেশে প্রতিবন্ধী কর্মী শ্রমবাজারে সবচেয়ে বেশি বাদ পড়ে। নীতিগত প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবায়নের ঘাটতি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ব্রিটিশ হাইকমিশন ঢাকার সামাজিক উন্নয়ন উপদেষ্টা তাহেরা জাবিন বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগ দেন এবং জোর দিয়ে বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি শুধুমাত্র মানবাধিকার নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধির জন্যও অপরিহার্য।
উদ্বোধনী অধিবেশনের প্রধান অতিথি ছিলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. সৈয়দ ফেরহাত আনোয়ার, যিনি অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রযুক্তি-ভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি ছাড়া প্রতিবন্ধী মানুষকে মূলধারায় আনা কঠিন।
প্রথম দিনের সেশনে বিভিন্ন গবেষণাপত্র উপস্থাপিত হয়, যার মধ্যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবিকা উন্নয়ন, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা এবং শিশুদের প্রতিবন্ধিতা সংক্রান্ত বিষয়গুলো বিশদভাবে আলোচিত হয়।
বিশেষ করে, গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, বিশেষ শিক্ষা ব্যবস্থা ও দক্ষতা বিকাশের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী যুবকদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো যায়। একই সঙ্গে, শিশুদের প্রারম্ভিক হস্তক্ষেপের গুরুত্বও তুলে ধরা হয়।
অধিবেশনের আরেকটি দিক ছিল ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান এবং কর্পোরেট সেক্টরে নিয়োগ বৈষম্য নিয়ে আলোচনা। অংশগ্রহণকারীরা ডিজিটাল স্বাস্থ্য সেবা ও আধুনিক প্রযুক্তির ভূমিকা নিয়ে মতবিনিময় করেন, যা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যের মান উন্নত করতে সহায়ক হতে পারে।
প্যানেল আলোচনায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শারমিন্দ নীলোর্মি অংশ নেন। তিনি নিজের প্রতিবন্ধী সন্তানের মা হিসেবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন এবং বলেন, কোনো ব্যক্তি একা সবকিছু সামলাতে পারে না; সামাজিক সমর্থন ও সহযোগিতা অপরিহার্য।
শারমিন্দের বক্তব্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয় যে, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং কর্মক্ষেত্রের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা কঠিন। তিনি সকল স্তরের অংশীদারদের সমন্বিত কাজের আহ্বান জানান।
সম্মেলনের আলোচনায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, নীতিগত কাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি বাস্তবায়ন পর্যায়ে ত্রুটি দূর করা জরুরি। গবেষকরা সুপারিশ করেন যে, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে যৌথভাবে লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসূচি চালু করতে হবে।
শিক্ষা ক্ষেত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে, অন্তর্ভুক্তিমূলক পাঠ্যক্রম এবং প্রযুক্তি-সহায়ক শিক্ষণ পদ্ধতি গ্রহণ করা হলে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বিকাশে বড় সহায়তা পাওয়া যাবে। এ ধরনের উদ্যোগগুলো ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান বাজারে তাদের প্রতিযোগিতা বাড়াবে।
অন্তে, এই সম্মেলনটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি কীভাবে টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি হতে পারে তা স্পষ্ট করে দেখায় এবং শিক্ষা, প্রযুক্তি ও নীতি সংযোগের মাধ্যমে বাস্তব পরিবর্তন আনার পথ নির্দেশ করে। আপনার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কি ধরনের প্রযুক্তি-সহায়ক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব, তা নিয়ে চিন্তা করুন এবং সংশ্লিষ্ট পদক্ষেপের পরিকল্পনা করুন।



