শুক্রবার (১৭ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে সরকারবিরোধী প্রতিবাদে বিশাল জনসমাবেশ দেখা যায়। রাজধানী তেল আবিবের হাবিমা স্কোয়ারে হাজারো নাগরিক রাস্তায় নেমে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার প্রশাসনের নীতি-নির্দেশের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায়।
প্রদর্শনকারীদের মূল দাবি গাজায় হামাসের হাতে আটক ও নিহত জিম্মি রান গভিলির দেহের ফেরত এবং ৭ অক্টোবরের হামাস আক্রমণের ওপর স্বাধীন রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশনের গঠন। একই সঙ্গে বর্তমান সরকারের বিচার সংস্কার পরিকল্পনার বিরোধিতা করে, তা দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
হাবিমা স্কোয়ারে অনুষ্ঠিত প্রধান সমাবেশে প্রাক্তন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও আইডিএফ প্রধান মোশে ইয়ালন তীব্র ভাষায় বর্তমান সরকারকে দুর্নীতিবাজ ও মেসিয়ানিক হিসেবে সমালোচনা করেন। তিনি ইসরায়েলকে কোনো বাহ্যিক অস্তিত্ব সংকটে নয়, বরং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটে জর্জরিত বলে উল্লেখ করে, সরকারের চরমপন্থী মন্ত্রীরা ইরানি শাসনের মতো দমন নীতি গ্রহণ করছেন বলে অভিযোগ করেন।
প্রদর্শকরা ব্যানার ও প্ল্যাকার্ডে ৭ অক্টোবরের ব্যর্থতার জন্য রাজনৈতিকভাবে নিয়োগকৃত তদন্ত কমিটির পরিবর্তে স্বতন্ত্র ও নিরপেক্ষ বিচারিক তদন্তের দাবি তুলে ধরেন। সমাবেশে উপস্থিতদের মধ্যে তরুণ ছাত্র, কর্মী, ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং সামরিক বাহিনীর প্রাক্তন সদস্যও ছিলেন, যারা একত্রে সরকারের নীতি-নির্দেশের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ সুরে সাড়া দিয়েছেন।
তেল আবিবের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য প্রান্তে, যেমন হাইফা, রামাত গ্যান, এবং নেজারেতের রাস্তায়ও সমান মাত্রার প্রতিবাদ দেখা যায়। বিভিন্ন শহরের বাসিন্দারা স্থানীয় মঞ্চে উঠে, সরকারী নীতি, বিশেষ করে বিচার সংস্কার ও গাজা পুনর্গঠন পরিকল্পনা নিয়ে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
মেইতারে জিম্মি রান গভিলির জন্মস্থান শহরে একটি বিশেষ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশে গভিলির বাবা-ইতজিক এবং মা-ত্যালিক উপস্থিত থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রশাসনের প্রতি কঠোর সমালোচনা করেন। তারা যুক্তি দেন, ট্রাম্প সরকারের গাজা পুনর্গঠন ও “বোর্ড অব পিস” গঠনের ত্বরান্বিত পদক্ষেপগুলো জিম্মি মুক্তির সম্পূর্ণ সফলতা নিশ্চিত হওয়ার আগে নেওয়া হয়েছে।
পিতামাতা গাজা অঞ্চলে হামাসের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তারা উল্লেখ করেন, হামাস যখন তাদের সন্তানকে ফেরত দিতে অস্বীকার করে, তখন শান্তি ও পুনর্গঠন নিয়ে কী ভিত্তিতে আলোচনা করা সম্ভব। তাদের মতে, হামাসের চুক্তি না মানার শর্তে গাজা পুনর্গঠন করা ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক।
সমাবেশে উপস্থিত কিছু মুক্ত জিম্মি এবং তাদের পরিবারও তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। তারা জোর দিয়ে বলেন, জিম্মি মুক্তির প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য ছিল, এবং এখনো দেহের ফেরত না পাওয়া পর্যন্ত পরিবারগুলো শোকের ছায়ায় বেঁচে আছে।
প্রদর্শনকারীরা সরকারের বর্তমান বিচার সংস্কার পরিকল্পনাকে দেশের সংবিধানিক কাঠামোর জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন। পরিকল্পনায় সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা হ্রাস এবং বিচারিক নিয়োগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা রয়েছে, যা স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার স্বায়ত্তশাসনকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে।
মেইতারের সমাবেশে উপস্থিত শত শত মানুষ, যার মধ্যে রান গভিলির স্কুল ও সেনাবাহিনীর বন্ধুরা, এবং কয়েকজন মুক্ত জিম্মি অন্তর্ভুক্ত, একত্রে সরকারের নীতি-নির্দেশের প্রতি তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করেন। সমাবেশের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ হলেও, অংশগ্রহণকারীরা দৃঢ়ভাবে তাদের দাবি পুনরাবৃত্তি করেন।
প্রতিবাদে ব্যবহৃত স্লোগান ও চিত্রগুলো স্পষ্টভাবে সরকারের নীতি-নির্দেশের প্রতি বিরোধিতা ও স্বতন্ত্র তদন্তের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। কিছু প্ল্যাকার্ডে “স্বাধীন তদন্ত, ন্যায়বিচার” এবং “বিচার সংস্কার না, গণতন্ত্র রক্ষা করো” লেখা দেখা যায়।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই বৃহৎ প্রতিবাদ ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উত্তেজনার একটি নতুন পর্যায়ের সূচনা নির্দেশ করে। সরকার যদি জনমতকে উপেক্ষা করে, তবে ভবিষ্যতে আরও তীব্র সামাজিক অশান্তি ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দিতে পারে।
অধিকন্তু, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ইসরায়েলের গাজা নীতি ও জিম্মি মুক্তির প্রক্রিয়ার প্রতি নজর রাখছেন। গাজা পুনর্গঠন ও শান্তি প্রক্রিয়ার সঠিক সমন্বয় না হলে, অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
সারসংক্ষেপে, ১৭ জানুয়ারি রাতের প্রতিবাদে ইসরায়েলের সরকার, বিচার সংস্কার, গাজা পুনর্গঠন এবং জিম্মি রান গভিলির দেহের ফেরত সংক্রান্ত বহু দাবি একসঙ্গে উঠে এসেছে। সরকার কীভাবে এই দাবিগুলোকে সমাধান করবে, তা দেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা ও নিরাপত্তার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।



