বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) গুলোর নন‑পারফর্মিং ঋণ (এনপিএল) অনুপাত সেপ্টেম্বর ২০২৫‑এ ৩৭.১১ শতাংশে পৌঁছেছে। এই সংখ্যা গত বছর একই সময়ে ৩৫.৫২ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েছে, যা আর্থিক খাতের চাপ বাড়ার ইঙ্গিত দেয়।
অনুপাতের এই উত্থান মূলত ক্রেডিট বৃদ্ধির ধীরগতি, ঋণ পুনরুদ্ধারের দুর্বলতা এবং দীর্ঘস্থায়ী শাসন কাঠামোর সমস্যার সমন্বয়ে ঘটেছে। এনবিএফআই গুলো মোট ৭৯,২৫১.১১ কোটি টাকা ঋণ প্রদান করেছে সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ, যার মধ্যে ২৯,৪০৮.৬৬ কোটি টাকা নন‑পারফর্মিং হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
অতীতের তুলনায় দেখা যায়, সেপ্টেম্বর ২০২৪‑এ ৩৫টি এনবিএফআই মোট ৭৩,৬৬২.৭৭ কোটি টাকার ঋণ বহন করছিল, যার মধ্যে ২৬,১৬৩.১৯ কোটি টাকা নন‑পারফর্মিং ছিল। অর্থাৎ, এক বছরের মধ্যে মোট ঋণ পরিমাণে প্রায় ৬% বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে নন‑পারফর্মিং অংশে প্রায় ১২% বৃদ্ধি ঘটেছে।
এই প্রবণতা দেশের আর্থিক বাজারে ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে। ঋণগ্রহীতাদের পেমেন্ট ক্ষমতা হ্রাস পেলে, এনবিএফআই গুলোর নগদ প্রবাহ সংকুচিত হবে, ফলে নতুন ঋণ প্রদানের সক্ষমতা কমে যাবে। তাছাড়া, উচ্চ নন‑পারফর্মিং অনুপাত ঋণদাতাদের জন্য রিজার্ভ প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে দিতে পারে, যা সামগ্রিক ক্রেডিট সরবরাহকে আরও সংকুচিত করবে।
বাজারে ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে, ঋণ পুনরুদ্ধারের হার কমে যাওয়ায় এনবিএফআই গুলোকে অতিরিক্ত রিসার্ভ বজায় রাখতে বাধ্য করা হচ্ছে। এই অতিরিক্ত রিসার্ভের ফলে তাদের লাভজনকতা হ্রাস পাবে এবং শেয়ারহোল্ডারদের রিটার্ন কমে যাবে। একই সঙ্গে, ঋণগ্রহীতাদের জন্য ঋণের সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা অর্থনৈতিক কার্যকলাপকে ধীরগতি করতে পারে।
শাসন সংক্রান্ত সমস্যাগুলোও এই অবনতিতে ভূমিকা রাখছে। কিছু এনবিএফআই তে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নীতি দুর্বল, ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব এবং পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার ঘাটতি দেখা যায়। এসব বিষয় নিয়মিত তদারকি না হলে নন‑পারফর্মিং ঋণের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
বৃহত্তর আর্থিক ব্যবস্থার জন্য এই পরিস্থিতি সতর্ক সংকেত হিসেবে কাজ করছে। ব্যাংকিং সেক্টরের সঙ্গে এনবিএফআই গুলোর আন্তঃনির্ভরতা বাড়ার ফলে নন‑পারফর্মিং ঋণ বৃদ্ধি হলে ব্যাংকগুলোর ঋণ পোর্টফোলিওতে পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে। ফলে, সিস্টেমিক ঝুঁকি বাড়ে এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়ে।
অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারকরা এখনই এই প্রবণতার মোকাবিলায় পদক্ষেপ নিতে পারেন। ঋণ মানদণ্ড কঠোর করা, রিস্ক ম্যানেজমেন্টে উন্নতি আনা এবং শাসন কাঠামো শক্তিশালী করা জরুরি। পাশাপাশি, এনবিএফআই গুলোর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ক্যাপিটাল ইনজেকশন বা রিসার্ভ রিলিফের মতো স্বল্পমেয়াদী সমর্থন ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে, যাতে ঋণ পুনরুদ্ধারের গতি ত্বরান্বিত হয়।
সংক্ষেপে, সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত এনবিএফআই গুলোর নন‑পারফর্মিং ঋণ অনুপাত ৩৭.১১ শতাংশে পৌঁছেছে, যা পূর্বের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। এই প্রবণতা ক্রেডিট প্রবাহের সংকোচন, লাভজনকতার হ্রাস এবং আর্থিক সিস্টেমে ঝুঁকি বাড়ার সম্ভাবনা নির্দেশ করে। নীতি নির্ধারক ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে শাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং তহবিল সরবরাহের ক্ষেত্রে ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে আর্থিক বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় থাকে এবং ভবিষ্যতে সম্ভাব্য সংকট এড়ানো যায়।



