রবিবার ঢাকা শহরের খামারবাড়িতে অবস্থিত কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে জুলাই গণ‑অভ্যুত্থানের শহীদ ও গুরুতর আহত পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। সভার আয়োজন করা হয় বিএনপি, এবং এতে উপস্থিত ছিলেন দলের চেয়ারপারসন তারেক রহমান, স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান সভাপতিত্বে, এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ কেন্দ্রীয় নেতারা বিশেষ অতিথি হিসেবে। শহীদ পরিবারের সদস্যরা নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করে, যা শহীদদের রক্তের বিনিময়ে ক্ষমতায় এসেছে বলে তারা অভিযোগ করে।
সভায় উপস্থিত ছিলেন তারেক রহমানের স্ত্রী জোবাইদা রহমান, যাঁর সঙ্গে অন্যান্য দর্শকগণও ছিলেন। শহীদ পরিবারগুলো ধারাবাহিকভাবে বলেছে যে, অন্তর্বর্তী সরকার যে ন্যায়বিচার, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা বাস্তবে কোনো রূপ নেয়নি। তারা নিরাপত্তাহীনতা, বিচারহীনতা এবং চিকিৎসা‑সঙ্কটের কথা তুলে ধরেছে, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনে বড় প্রভাব ফেলছে।
শহীদ শাফিক উদ্দিন আহমেদ আহনাফের মা শাহনাজ পারভীন, যিনি ঢাকা মিরপুর‑১০ এলাকায় ৪ আগস্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে নিহত তার সন্তানকে স্মরণ করে কথা বলেছেন। তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর তিনি দ্রুত বিচার প্রত্যাশা করছিলেন, কিন্তু এখন সেই আশা ভেঙে গেছে; শাফিকের হত্যাকারীরা এখনও ঘরে ঘুমাচ্ছেন এবং কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তিনি নতুন সরকারের প্রতি অনুরোধ করেন যেন পূর্বের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো বেইমানি না করে, এবং সব শহীদকে সমান দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়।
অন্যদিকে, উত্তরার চাপড়া মসজিদ এয়ারপোর্ট এলাকায় ৫ আগস্ট গুলিতে নিহত আবদুল্লাহ বিন জাহিদের মা ফাতেমা তুজ‑জোহরা তার পরিবারের কষ্টের কথা তুলে ধরেছেন। ছয় মাসের মধ্যে তার স্বামীও মারা গেছেন, আর ছোট ছেলে জিসান কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত; তিনি তিনবার স্বাস্থ্য উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে চিকিৎসা সহায়তা চেয়েছেন, তবে একদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করেও কোনো সহায়তা পাননি। তিনি স্বীকার করেছেন যে, বিএনপি পক্ষ থেকে কিছু সহায়তা পাওয়া গেছে, তবে তা তার ছেলের চিকিৎসার জন্য যথেষ্ট নয়।
শহীদ পরিবারগুলো একত্রে দাবি করে যে, অন্তর্বর্তী সরকারকে জুলাই‑আগস্টের গণ‑অভ্যুত্থানের সব শহীদকে সমানভাবে বিবেচনা করতে হবে এবং প্রতিশ্রুত ন্যায়বিচার, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। তারা জোর দিয়ে বলেন যে, কোনো পার্থক্য না করে সব পরিবারকে সমান দৃষ্টিতে দেখা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি রোধ করা যায়।
বিএনপি নেতারা শহীদ পরিবারের এই দাবিগুলোকে স্বীকার করে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্বে থাকা ন্যায়বিচার ও মানবিক সহায়তার দায়িত্বকে তীব্রভাবে তুলে ধরেছেন। তারা বলেছে, যদি সরকার দ্রুত পদক্ষেপ না নেয়, তবে তা জনমতকে আরও উত্তেজিত করতে পারে এবং দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তুলবে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, এই সভা অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর বাড়তে থাকা চাপকে প্রকাশ করে এবং আসন্ন পার্লামেন্টারি নির্বাচনের পূর্বে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে তীব্র করতে পারে। শহীদ পরিবারগুলোর কণ্ঠস্বরকে বিএনপি তার নির্বাচনী প্রচারণার মূল বিষয়বস্তু হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, যা ভোটারদের মধ্যে সরকারে আস্থা হ্রাসের সম্ভাবনা বাড়ায়।
বিএনপি আরও জানিয়েছে যে, শহীদ পরিবার ও আহতদের সমস্যাকে জাতীয় আলোচনায় তুলে ধরতে তারা অনুরূপ ফোরাম আয়োজন চালিয়ে যাবে, এবং সরকারকে বাস্তবিক পদক্ষেপ নিতে চাপ দেবে। এই ধরনের ধারাবাহিক আন্দোলন শহীদদের কষ্টকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে রাখবে এবং ভবিষ্যতে ন্যায়বিচার ও চিকিৎসা সহায়তার বাস্তবায়নে প্রভাব ফেলতে পারে।
অবশেষে, পর্যবেক্ষকরা অনুমান করছেন যে, শহীদ পরিবারগুলোর অব্যাহত দাবি এবং তাদের সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সক্রিয়তা দেশের রাজনৈতিক গতিপথকে পুনর্গঠন করতে পারে, বিশেষ করে সেই এলাকায় যেখানে জুলাই‑আগস্টের অশান্তি বেশি ছিল। এই প্রেক্ষাপটে সরকারকে দ্রুত এবং সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে, নতুবা জনমতকে আরও ক্ষুব্ধ করে নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।



