দক্ষিণ এশিয়ার স্থায়ী শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং সমন্বিত উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার ও সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে মানুষে মানুষে সম্পর্ককে শক্তিশালী করা একমাত্র কার্যকর উপায়, এ কথা রবিবার বিকেলে ঢাকা শহরের বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সার্ক কালচারাল সোসাইটির বার্ষিক সাধারণ সভায় প্রকাশিত হয়। সভাটি দেশের প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব মসয়ূদ মান্নানকে প্রধান বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়ে অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় সার্ক কালচারাল সোসাইটির কার্যকরী সভাপতি এটিএম মমতাজুল করিমের নেতৃত্বে আলোচনা চালানো হয় এবং সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সুজন দে বার্ষিক রিপোর্ট উপস্থাপন করেন। রিপোর্টে সংগঠনের গতবছরের কার্যক্রম, সাংস্কৃতিক বিনিময় প্রকল্প এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
সভায় উপস্থিত নেতারা উল্লেখ করেন যে, দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য ১৯৭০-এর দশকে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সার্ক গঠন করার উদ্যোগ নেন। পরবর্তীতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সার্কের প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ শুরু করেন।
তবে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে সার্কের কাঠামো এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কার্যকরী না থেকে যায়। এই অকার্যকারিতা অঞ্চলীয় সহযোগিতা ও নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং বহুবার পুনর্গঠন প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করেছে।
মসয়ূদ মান্নান এই প্রেক্ষাপটে জোর দিয়ে বলেন যে, সরকারী উদ্যোগের পাশাপাশি সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য এবং পেশাগত ক্ষেত্রের মানুষদের মধ্যে সরাসরি সংযোগ গড়ে তোলা প্রয়োজন। তিনি উল্লেখ করেন যে, সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও আস্থা গড়ে তোলা তুলনামূলকভাবে সহজ এবং তা দীর্ঘমেয়াদী শান্তির ভিত্তি স্থাপন করতে পারে।
সভায় সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট মোশারফ হোসেন মনির, এইচএম ইব্রাহিম ভূঁইয়া, আব্দুল জলিল, কবি নজরুল বাঙালি, নরেশ হালাদার, সাধারণ সম্পাদক সুজন দে, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহিদ বিপ্লব, ইশতিয়াক আহমেদ রিগান, ড. জাহাঙ্গীর আলম, যুগ্ম আন্তর্জাতিক সম্পাদক নিয়াজ মাহমুদ সোহেল, কেন্দ্রীয় নেতা টিনা খান, পারভেজ অনিক, রেদওয়ান আবির চৌধুরী জয়, রাজন আহমেদ শিশির, মেহেদী হাসান ইমন, জিনিয়া জোসনা, মলয় নাথ, মো. খায়রুল আলম, রবিউল আলম রবি, সামান্তা শাহিন, মঞ্জুর হোসেন ঈসা, এম. আজমল খান, মো. কাইয়ুম খান, আমজাদ হোসেন সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন।
এই বিশাল তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিরা সংস্কৃতি, সাংবাদিকতা, কবিতা, শিল্প, সাহিত্য, বুদ্ধিজীবিতা এবং পেশাগত ক্ষেত্রের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাদের সমন্বিত বক্তব্যে জোর দেওয়া হয় যে, মানুষে মানুষে সম্পর্ককে দৃঢ় করার জন্য সাংস্কৃতিক কর্মশালা, শিল্প প্রদর্শনী, সাহিত্যিক সেমিনার এবং পেশাগত নেটওয়ার্কিং ইভেন্টের আয়োজন করা উচিত।
বক্তারা উল্লেখ করেন যে, এ ধরনের উদ্যোগগুলো শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক বিনিময়ই নয়, বরং অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং নিরাপত্তা সংলাপের জন্যও মঞ্চ সরবরাহ করবে। তারা প্রস্তাব করেন যে, সার্কের সদস্য দেশগুলোতে নিয়মিতভাবে যৌথ সংস্কৃতি উৎসব এবং শিল্প মেলায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি করা যায়।
অধিকন্তু, সভায় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একাডেমিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাবও উপস্থাপন করা হয়। এতে ছাত্র ও গবেষকদের বিনিময়, যৌথ গবেষণা প্রকল্প এবং সম্মেলনের মাধ্যমে জ্ঞান ভাগাভাগি করা সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই উদ্যোগকে অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদী শান্তি প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে মূল্যায়ন করছেন। তারা উল্লেখ করেন যে, সরকারী স্তরে নীতি নির্ধারণের পাশাপাশি নাগরিক স্তরে সংলাপ ও সহযোগিতা বৃদ্ধি পেলে সার্কের কাঠামো পুনরুজ্জীবিত হতে পারে এবং ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের উত্তেজনা হ্রাস পেতে পারে।
সার্ক কালচারাল সোসাইটির বার্ষিক সাধারণ সভা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অংশগ্রহণকারীরা একমত হন যে, মানুষে মানুষে সম্পর্ককে শক্তিশালী করা শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক দিকেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তা ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এ ধরনের সমন্বিত প্রচেষ্টা দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ শান্তি ও সমৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।



