যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত শনিবার তার সামাজিক নেটওয়ার্ক ‘ট্রুথ সোশ্যাল’‑এ জানিয়েছেন যে, ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ফিনল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্য থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর অতিরিক্ত দশ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের উত্তেজনা বাড়ে, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তীব্র আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
ট্রাম্পের শুল্ক নীতি তার দীর্ঘদিনের গ্রিনল্যান্ডের সম্পূর্ণ মালিকানা অর্জনের ইচ্ছার সঙ্গে যুক্ত। তিনি যুক্তি দেন যে, গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত অবস্থান ও বিশাল খনিজ সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য, ফলে এই অঞ্চলকে যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে আনা উচিত। এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপীয় অংশীদারদের মধ্যে বিশেষ করে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, দ্বীপটি বিক্রয়ের জন্য নয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে তারা কোনোভাবেই ইচ্ছুক নয়।
ডাচ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ভ্যান উইল ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে ‘ব্ল্যাকমেইল’ হিসেবে বর্ণনা করে তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, শুল্ক আরোপের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করা একধরনের জবরদস্তি এবং তা সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়। তার মতে, এই ধরনের আচরণ ন্যাটো জোটের ঐক্যকে ক্ষুণ্ণ করে এবং গ্রিনল্যান্ড বা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কৌশলগত স্বার্থে ফলপ্রসূ হবে না।
আটলান্টিকের দুই প্রান্তের দেশগুলোর মধ্যে বাড়তে থাকা কূটনৈতিক উত্তেজনা রোয়টার্সের প্রতিবেদনে বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে। শুল্কের ঘোষণার পরপরই ইউরোপীয় দেশগুলো ট্রাম্পের নীতিকে কঠোর বিরোধিতা জানিয়ে তাদের নিজস্ব বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণের ইঙ্গিত দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নেটওয়ার্কে আলোচনার মাত্রা বাড়ে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তার ছায়া পড়ে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে জানান যে, ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড সংক্রান্ত দৃঢ় অবস্থান এবং শুল্ক যুদ্ধ ইউরোপের প্রধান অর্থনীতিগুলোর ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শুল্কের ফলে পণ্যের দাম বাড়বে, সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটবে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ব্যয়বহুল হতে পারে। এ ধরনের আর্থিক চাপ বিশ্ববাজারে নতুন অস্থিরতা সৃষ্টির সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক একটি গভীর সংকটের মুখে। শুল্ক আরোপের সঙ্গে সঙ্গে দু’পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসের ফাটল গভীরতর হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরও কঠোর কূটনৈতিক আলোচনার দরজা খুলে দিতে পারে। উভয় পক্ষই এখন কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করে সমঝোতার পথ খোঁজার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তবে শুল্কের প্রভাব ও গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা সংক্রান্ত দাবিগুলো এখনও সমাধানহীন রয়ে গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ভ্যান উইল উল্লেখ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের একতরফা পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা ও সহযোগিতার জন্য হুমকি স্বরূপ। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, ন্যাটো জোটের ঐক্য বজায় রাখতে সকল সদস্য দেশের স্বার্থের সমতা রক্ষা করা জরুরি, এবং কোনো দেশই অন্যকে চাপ দিয়ে স্বার্থ অর্জন করতে পারে না।
শুল্কের বাস্তবায়ন শুরু হলে ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের নিজস্ব প্রতিক্রিয়া জানাবে, যার মধ্যে বিকল্প বাণিজ্যিক চুক্তি অনুসন্ধান, শুল্কের প্রতিক্রিয়ায় রিটারিয়াল ট্যারিফ আরোপ বা WTO-তে অভিযোগ দায়ের করা অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। একই সঙ্গে, গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসন ও মালিকানা সংক্রান্ত বিতর্কও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।
সারসংক্ষেপে, ট্রাম্পের শুল্ক ঘোষণার ফলে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নতুন এক সংকটের পর্যায়ে পৌঁছেছে। ডাচ পররাষ্ট্র মন্ত্রী ভ্যান উইলের কঠোর সমালোচনা এবং বিশ্লেষকদের সতর্কতা এই পরিস্থিতির গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ভবিষ্যতে কীভাবে এই দ্বন্দ্ব সমাধান হবে, তা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতির ওপর নির্ভরশীল থাকবে।



