মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর, রবিবার ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানালেন যে, জুলাই‑আগস্ট ২০২৪‑এর গণ‑অভ্যুত্থানের সময় সবচেয়ে নিষ্ঠুর অপরাধে জড়িত ২৮ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। একই দিনে ট্রাইব্যুনাল মোহাম্মদপুরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২৮ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে উপস্থাপন করেছে।
প্রসিকিউটর উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের ১৮ ও ১৯ জুলাই দেশের ইতিহাসের অন্যতম রক্তাক্ত দিন ছিল, যেখানে মোহাম্মদপুর এলাকায় গুলিবর্ষণের ফলে নয়জনের প্রাণ ত্যাগ হয়। শিকারের তালিকায় ফারহান ফাইয়াজ, মাহমুদুর রহমান সৈকত, রাজু আহমেদ, মাহিন, মোহাম্মদ রনি, আল শাহরিয়ার রোকন, ইসমাইল হোসেন, জসিম উদ্দীন এবং জুবাইদ হোসেন ইমন অন্তর্ভুক্ত। এই শহীদদের রক্তের বিনিময়ে আজকের বাংলাদেশ গড়ে উঠেছে, এ কথাটি তাজুল ইসলাম জোর দিয়ে বললেন।
প্রসিকিউটর জানান, জুলাই‑অভ্যুত্থানের সময় যারা সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছে, যারা সংগঠনের ভূমিকা পালন করেছে, পরিকল্পনা, নির্দেশনা বা মাস্টারমাইন্ড হিসেবে কাজ করেছে, তাদের প্রত্যেককে আইনি দায়ের মুখোমুখি করা হবে। এই অঙ্গীকারের ভিত্তিতে তদন্ত সংস্থা মামলায় প্রাসঙ্গিক প্রতিবেদন ও প্রমাণাদি আদালতে দাখিল করেছে। তাজুল ইসলাম উল্লেখ করেন, ২৯ জানুয়ারি পরবর্তী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচারিক কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি নেওয়া হবে।
মাহমুদুর রহমান সৈকত সম্পর্কে প্রসিকিউটর অতিরিক্ত তথ্য শেয়ার করেন। সৈকতকে প্রাণবন্ত ও উচ্চতা ছয় ফুটের মতো বলে বর্ণনা করা হয়। ১৯ জুলাই, মা-কে না জানিয়ে মোহাম্মদপুরে আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে, চীনা রাইফেল ব্যবহারকারী পুলিশ গুলিবর্ষণ শুরু করে। গুলি তার কপাল ভেদ করে পেছন থেকে বেরিয়ে এসে শিকারের কারণ হয়। ফাইয়াজের ক্ষেত্রেও একই সময়ে গুলিবর্ষণ ঘটেছিল, যা তরুণদের মধ্যে ব্যাপক শোক ও রাগের সঞ্চার ঘটায়। তাজুল ইসলাম বলেন, এই দুই শহীর ঘটনা ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে তীব্রভাবে প্রভাবিত করেছিল এবং এখন তা আদালতে উপস্থাপন করা হবে।
ট্রাইব্যুনাল ও তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ে গৃহীত পদক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতে, আগামী সপ্তাহে মামলার শোনানির জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও সাক্ষ্য প্রস্তুত করা হবে। আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রকৃতি, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন প্রমাণিত হলে, যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। তাজুল ইসলাম শেষ পর্যন্ত উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের মাটিতে এই নিষ্ঠুরতম হত্যাকারীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে, ইনশাআল্লাহ।
এই মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে কিছু নাম ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে, তবে তদন্ত সংস্থা সব দিক থেকে প্রমাণ সংগ্রহে ব্যস্ত। গুলিবর্ষণের সুনির্দিষ্ট সময়, গুলি চালানোর পদ্ধতি, এবং গুলি চালানো ব্যক্তিদের পরিচয় সংক্রান্ত তথ্য ইতিমধ্যে আদালতে দাখিল করা হয়েছে। তদুপরি, গুলিবর্ষণের সময় উপস্থিত সিভিল ও মিডিয়া কর্মীদের সাক্ষ্যও মামলায় গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হবে।
প্রসিকিউটর তাজুলের মতে, এই মামলায় বিচার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধ করা যায়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দেশের নিরাপত্তা ও শাসনব্যবস্থার সুরক্ষায় আইনি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা অপরিহার্য, এবং এ ধরনের অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
সারসংক্ষেপে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জুলাই‑অভ্যুত্থানের সময় মোহাম্মদপুরে গুলিবর্ষণ ঘটিয়ে ৯ জন শহীদকে হারানো এবং বহু মানুষকে আহত করা অপরাধীদের বিরুদ্ধে ২৮ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছে। তদন্ত সংস্থা ইতিমধ্যে প্রমাণাদি আদালতে দাখিল করেছে এবং ২৯ জানুয়ারি পরবর্তী পর্যায়ে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হবে। তাজুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন, দেশের মাটিতে এই নিষ্ঠুরতম হত্যাকারীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।



