ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনে রোববার অনুষ্ঠিত সিতারা পারভীন ট্রাস্টের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার ও দায়িত্বের সম্পর্ক নিয়ে বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতক (সম্মান) ২০২৩ ব্যাচের দশজন শিক্ষার্থীকে বৃত্তি প্রদান করা হয়।
মাহফুজ আনামের মতে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের মৌলিক স্তম্ভ হলেও তা ব্যবহার করার সময় সতর্কতা ও দায়িত্ববোধ অপরিহার্য। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, কোনো মতামত প্রকাশের আগে তা তথ্যভিত্তিক, গবেষণাপ্রসূত এবং পক্ষপাতমুক্ত হওয়া উচিত। এই নীতি অনুসরণ না করলে সমাজে ভুল ধারণা ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে।
বক্তৃতায় তিনি উল্লেখ করেন যে, স্বাধীন মতপ্রকাশের ধারণা আধুনিক যুগে প্রায় আট থেকে নয় দশক আগে গড়ে ওঠে, আর শেষ পঞ্চাশ বছরে এর বিকাশ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই স্বাধীনতার বিকৃতি বাড়ছে, যা সংবাদমাধ্যমের স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
মাহফুজ আনাম জোর দিয়ে বলেন, স্বাধীনতা এবং দায়িত্ব একসঙ্গে চলতে হবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “আপনি যা ভাবছেন তা কি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে? গবেষণার ভিত্তিতে কি তা গঠন করা হয়েছে? নাকি কেবল আবেগের ঢেউয়ে সাড়া দিয়ে বলা হয়েছে?” এই ধরনের স্ব-পর্যালোচনা না করলে মত প্রকাশের সত্যিকারের মূল্য হারিয়ে যায়।
সাংবাদিকতাকে তিনি স্বাধীন মতপ্রকাশের একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হিসেবে উপস্থাপন করেন। তার মতে, সাংবাদিকতা কেবল তথ্য সরবরাহের কাজ নয়, বরং সমাজের বিভিন্ন স্তরে মতবিনিময়কে সুগম করার মাধ্যম। তাই সাংবাদিকদের উচিত স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে নৈতিক দায়িত্ব পালন করা, যাতে জনমত গঠন প্রক্রিয়ায় সঠিক তথ্যের ভূমিকা বজায় থাকে।
আজকের ডিজিটাল যুগে সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব অপরিসীম। মাহফুজ আনাম স্বীকার করেন, সোশ্যাল মিডিয়া তথ্যের দ্রুত বিস্তারকে সহজ করেছে, তবে একই সাথে ভুল তথ্যের দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়িয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, “সোশ্যাল মিডিয়া একদিকে আশীর্বাদ, অন্যদিকে বিপদ।”
এই দ্বৈত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তিনি সাংবাদিক ও ছাত্রদের আহ্বান জানান, যে তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। কোনো পোস্ট বা সংবাদ শেয়ার করার আগে তার উৎস, প্রমাণ এবং প্রাসঙ্গিকতা যাচাই করা জরুরি। এভাবে তথ্যের গুণগত মান বজায় রাখা সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানে বৃত্তি প্রাপ্ত দশজন শিক্ষার্থীকে সিতারা পারভীন ট্রাস্টের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। এই বৃত্তি তাদের গবেষণা ও লেখালেখি চালিয়ে যেতে সহায়তা করবে, যা ভবিষ্যতে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার ভিত্তি গড়ে তুলবে।
মাহফুজ আনাম শেষ পর্যন্ত বলেন, “সামাজিক পরিবর্তনের সময়ে সাংবাদিকতা এবং শিক্ষার ভূমিকা অপরিবর্তনীয়। আমাদের নতুন প্রজন্মকে তথ্যের সত্যতা ও নৈতিক দায়িত্বের গুরুত্ব শেখাতে হবে।” তিনি ছাত্র-ছাত্রীদেরকে উৎসাহ দেন, যাতে তারা গবেষণা-ভিত্তিক বিষয়বস্তু তৈরি করে সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রায়োগিক দৃষ্টিকোণ থেকে, সাংবাদিকতা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে যারা কাজ করছেন তাদের জন্য একটি সহজ টিপস: প্রতিটি তথ্যের উৎস যাচাই করুন, একাধিক সূত্র থেকে নিশ্চিত করুন, এবং প্রকাশের আগে বিষয়টি সমালোচনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করুন। এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে স্বাধীন মতপ্রকাশের সঙ্গে দায়িত্বের সঠিক সমন্বয় সম্ভব হবে।



