জুলাই ২০২৪-এ ঢাকা শহরের মোহাম্মদপুরে গণঅভ্যুত্থানের সময় গুলিবর্ষণে নয়জনের মৃত্যু ঘটার পর, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল‑১ (আইসিটি‑১) ২৪ জন সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গ্রহণ করে। আদালতে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম অভিযোগপত্র উপস্থাপন করেন, যেখানে ২০২৪ সালের ১৮ ও ১৯ জুলাইকে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তাক্ত দিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের ছাত্র ফারহান ফায়াজ, মাহমুদুর রহমান সৈকতসহ মোট নয়জনের মৃত্যু ঘটায় গুলিবর্ষণটি সংগঠিত করা হয়। মামলায় মোট ২৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস অন্তর্ভুক্ত।
আইসিটি‑১-এ রায় শোনানো হয় ১৮ জানুয়ারি, যেখানে চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদার নেতৃত্বে তিন সদস্যের প্যানেল সিদ্ধান্ত নেয়। প্যানেলের বাকি দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। রায়ের পর, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়, যদিও অভিযুক্তদের মধ্যে বেশ কয়েকজন পলাতক অবস্থায় রয়েছে।
বর্তমানে কারাগারে আটকে থাকা চারজন হলেন নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের মোহাম্মদপুর থানা সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, সহসভাপতি সাজ্জাদ হোসেন, ওমর ফারুক এবং ফজলে রাব্বি। অন্যদিকে, পলাতক অবস্থায় থাকা কয়েকজনের মধ্যে ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক এডিশনাল ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার এবং ডিএমপির সাবেক যুগ্ম পুলিশ কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার অন্তর্ভুক্ত।
প্রসিকিউশনের অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ডিএসসিসির তৎকালীন মেয়র তাপস, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে মোহাম্মদপুরে সশস্ত্র বাহিনী পাঠানো এবং আন্দোলন দমনে হেলিকপ্টার ও ড্রোন ব্যবহারের পরামর্শ দেন। এই পরামর্শের ফলে গুলিবর্ষণ এবং হত্যাযজ্ঞের সূচনা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
আদালতে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম অভিযুক্তদের কমান্ড রেসপনসিবিলিটি ও ষড়যন্ত্রের দিকটি তুলে ধরেন, যা গুলিবর্ষণের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে মূল ভূমিকা পালন করেছে বলে তিনি যুক্তি দেন। অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, গুলিবর্ষণের সময় ব্যবহৃত অস্ত্র ও গুলি সরবরাহের দায়িত্বও অভিযুক্তদের ওপর আরোপিত হয়েছে।
আইসিটি‑১-এ রায়ের পর, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এখনো পলাতক অভিযুক্তদের অনুসন্ধান ও গ্রেপ্তার করার দায়িত্ব রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় অনুসারে, যদি পলাতকরা আত্মসমর্পণ না করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জেল বা অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে।
এই মামলার পরবর্তী ধাপ হিসেবে, আদালত আগামী সপ্তাহে পুনরায় শুনানির তারিখ নির্ধারণের সম্ভাবনা প্রকাশ করেছে। সেই সময়ে, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করা হবে এবং পলাতক অভিযুক্তদের অবস্থান জানার জন্য অতিরিক্ত তদন্ত চালু হবে। এছাড়া, সংশ্লিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের শাস্তি নির্ধারণের কাজও চলবে।
মোহাম্মদপুরে ঘটিত এই হত্যাকাণ্ডের আইনি দিক থেকে বিশ্লেষণ করা হলে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। একই সঙ্গে, এই রায়ের বাস্তবায়ন ও পলাতক অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার নিশ্চিত করা দেশের আইনি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য।
সারসংক্ষেপে, জুলাই ২০২৪-এ মোহাম্মদপুরে গুলিবর্ষণে নিহত নয়জনের মামলায় ২৪ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে, যার মধ্যে কয়েকজন ইতিমধ্যে কারাগারে রয়েছে এবং বাকি কয়েকজন পলাতক অবস্থায় রয়েছে। আদালতের রায় অনুসারে, পলাতকদের অনুসন্ধান ও গ্রেপ্তার দ্রুততর করা হবে এবং পরবর্তী শুনানিতে মামলার আইনি দিকগুলো আরও স্পষ্ট করা হবে।



