রোববার, ১৮ জানুয়ারি, নির্বাচন কমিশনের অডিটোরিয়ামে টাঙ্গাইল-৪ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর মনোনয়নের বৈধতা নিয়ে শেষ দিনের আপিল শোনা হয়। জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে সিদ্দিকীর প্রার্থীতা বজায় থাকবে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে পার্টি নিষিদ্ধের বিষয় এবং ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞার পার্থক্য নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয়।
শুনানির মূল বিষয় ছিল জাতীয় পার্টির নেতা হিসেবে সিদ্দিকীর অংশগ্রহণের অনুমোদন। জাতীয় পার্টির প্রার্থী মো. লিয়াকত আলী, যিনি একই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নাম নথিভুক্ত করছিলেন, তার আইনজীবী আপিলের মাধ্যমে দাবি করেন যে সিদ্দিকী নিষিদ্ধ দলের নেতা হওয়ায় তিনি সংসদীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। এই আপিলের লক্ষ্য ছিল সিদ্দিকীর নাম বাতিল করে লিয়াকত আলীর জন্য ভোটের ক্ষেত্র পরিষ্কার করা।
লিয়াকত আলীর আইনজীবী আপিলের সময় উল্লেখ করেন যে সরকার পূর্বে একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করেছে এবং সেই দলের নেতাদের নির্বাচনী অংশগ্রহণে বাধা আরোপ করা উচিত। তিনি তর্ক করেন যে দল নিষিদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার সকল নেতা ও সদস্যকে একই নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা উচিত, যাতে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় থাকে। এই যুক্তি নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের মধ্যে তীব্র আলোচনা সৃষ্টি করে।
আব্দুর রহমানেল মাছউদের মন্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে যদিও সরকার একটি দলকে নিষিদ্ধ করেছে, তবে কোনো ব্যক্তিকে সরাসরি নিষিদ্ধ করা হয়নি। তিনি বলেন, “পার্টি নিষিদ্ধ হয়েছে, ব্যক্তি নিষিদ্ধ হয়নি,” যা নির্দেশ করে যে দলীয় নিষেধাজ্ঞা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যক্তিগত প্রার্থীকে বাদ দেয় না। এই বক্তব্যের ভিত্তিতে তিনি শোনান যে সিদ্দিকীর প্রার্থীতা এখনও বৈধ এবং তাকে ভোটের তালিকায় রাখা যায়।
শুনানির সমাপ্তিতে নির্বাচন কমিশন সিদ্দিকীর মনোনয়নের বৈধতা বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। কমিশন উল্লেখ করে যে দলীয় নিষেধাজ্ঞা এবং ব্যক্তিগত প্রার্থীর যোগ্যতার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে, এবং বর্তমান আইনি কাঠামো অনুযায়ী সিদ্দিকীর প্রার্থীতা রদ করা যায় না। ফলে লিয়াকত আলীর আপিল প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং সিদ্দিকী নির্বাচনী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকে।
এই সিদ্ধান্তের পর উভয় দলের প্রতিনিধিরা নিজ নিজ অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। জাতীয় পার্টি তার নেতার অংশগ্রহণের পক্ষে যুক্তি জোরালোভাবে তুলে ধরে, আর লিয়াকত আলীর দল এই ফলাফলে অসন্তোষ প্রকাশ করে এবং আইনি পথে পুনরায় চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দেয়। তবে কমিশনের চূড়ান্ত রায়ের ভিত্তিতে এখন পর্যন্ত কোনো অতিরিক্ত আপিল দাখিল করা হয়নি।
দল নিষিদ্ধের পেছনে সরকার যে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে, তা ২০২২ সালে সংশ্লিষ্ট পার্টির বিরুদ্ধে গৃহীত আদেশে ভিত্তিক। ঐ আদেশে দলকে অবৈধ ঘোষণা করা হয় এবং তার কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে সেই আদেশে কোনো ব্যক্তিগত সদস্যকে সরাসরি নিষিদ্ধ করার উল্লেখ নেই, যা আজকের কমিশনারের মন্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে এই রায় আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে। টাঙ্গাইল-৪ আসনে সিদ্দিকীর উপস্থিতি ভোটারদের পছন্দের বিকল্প বাড়িয়ে দেবে এবং লিয়াকত আলীর ভোটের সম্ভাবনা কমিয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে, দল নিষিদ্ধের পরেও ব্যক্তিগত প্রার্থীর অংশগ্রহণের অনুমোদন অন্যান্য নিষিদ্ধ দলের নেতাদের জন্যও দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্তের পরবর্তী ধাপ হবে ভোটার তালিকায় প্রার্থীর নামের চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণ এবং নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়া। উভয় প্রার্থীই এখন তাদের প্রচারাভিযান চালিয়ে যাবে, এবং ভোটাররা আসনের জন্য তাদের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। নির্বাচন কমিশন পরবর্তী কোনো আপিল বা আইনি চ্যালেঞ্জের জন্য প্রস্তুত থাকবে, তবে বর্তমান রেকর্ড অনুযায়ী সিদ্দিকীর প্রার্থীতা বৈধ বলে গণ্য করা হয়েছে।
সারসংক্ষেপে, রোববারের শুনানিতে জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনারের স্পষ্ট মন্তব্যের ভিত্তিতে দল নিষিদ্ধ হলেও ব্যক্তিগত প্রার্থীকে নিষিদ্ধ করা হয়নি বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই রায় টাঙ্গাইল-৪ আসনের রাজনৈতিক গতিপথকে নতুন দিক দেয় এবং আসন্ন নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে দাঁড়ায়।



