বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৪তম বার্ষিকীতে দেশটি উদযাপন নয়, বরং তার বর্তমান অবস্থার বিশ্লেষণমূলক পর্যালোচনার মুখোমুখি। জুলাই ২০২৪-এ ঘটিত উত্থান, যা স্বৈরতান্ত্রিক শাসনকে উল্টে দেয়, তা সংবিধানিক ধারাবাহিকতার ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। দশকের বেশি সময় ধরে আইনকে স্বৈরতান্ত্রিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছিল, এবং এখন অস্থায়ী সরকার “জুলাই চার্টার” বাস্তবায়ন ও সুপ্রিম কোর্টের মাধ্যমে কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এই পরিবর্তনগুলো সংবিধান ১৯৭২ কি এখনও সর্বোচ্চ আইন হিসেবে কার্যকর, নাকি সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর ফলে তা কার্যত অকার্যকর হয়ে গেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
সংবিধানের প্রতিষ্ঠার বছর ১৯৭২-কে সর্বদা সম্মানিত করা হয়েছে, তবে ২০২৫ সালের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা সেই সম্মানকে পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করছে। ১৯৭২ সালের মূল পাঠ্য, যদিও রূপান্তরমূলক লক্ষ্য নিয়ে গড়া, তবু স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতাকে রোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই সময়ে সংবিধান কোনো সামরিক আইন দ্বারা স্থগিত হয়নি; বরং ধারাবাহিক সংশোধনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তার মূল শক্তি হ্রাস পেয়েছে। এখন বিচারিক পুনর্জাগরণ ও জনগণের পুনর্গঠন চাহিদার মধ্যে একটি অনন্য সংঘর্ষ দেখা দিচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সম্প্রতি থার্টিন্থ অ্যামেন্ডমেন্ট পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে এনেছে, যা বিচারিক আত্মসমালোচনার উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়। ২০১১ সালের পূর্ববর্তী রায়কে “মূল পাপ” হিসেবে বিবেচনা করে, আদালত এই পদক্ষেপকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বাড়ানোর প্রচেষ্টা হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তবে এই পুনরুজ্জীবন ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এটি আইনসভার ক্ষমতার অতিরিক্ত ব্যবহার রোধের জন্য গৃহীত মৌলিক কাঠামো নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
অ্যানোয়ার হোসেন চৌধুরীর মামলায় আদালত মৌলিক কাঠামো নীতি প্রয়োগ করে সংবিধানকে আইনসভার অযৌক্তিক পরিবর্তন থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এই নীতি সংবিধানের মূল তত্ত্বকে অক্ষত রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, এবং এখন তা পুনরায় পরীক্ষা করা হচ্ছে যে বর্তমান রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলো এই নীতির সীমানার মধ্যে আছে কি না।
অস্থায়ী সরকারের “জুলাই চার্টার” সংবিধানিক সংস্কারের একটি প্রধান দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই চার্টারটি স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অবসান ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পুনঃপ্রতিষ্ঠা লক্ষ্য করে, তবে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় আইনগত ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা সংবিধানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে, তবে তা সঠিকভাবে কার্যকর না হলে আবার স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা ফিরে আসার ঝুঁকি থাকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন যে সংবিধানের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে বিচারিক স্বতন্ত্রতা, সংসদীয় তত্ত্বাবধান এবং জনগণের অংশগ্রহণের উপর। যদি আদালত মৌলিক কাঠামো নীতি বজায় রাখে এবং অস্থায়ী সরকার সংবিধানিক নীতিগুলোকে সম্মান করে, তবে সংবিধান পুনরায় শক্তিশালী হতে পারে। অন্যদিকে, যদি রাজনৈতিক দলগুলো সংবিধানিক সংস্কারকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে, তবে বর্তমান সংবিধানিক কাঠামো কার্যত অকার্যকর হয়ে যেতে পারে।
সারসংক্ষেপে, সংবিধানের ৫৪তম বর্ষে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। জুলাই ২০২৪ উত্থান, অস্থায়ী সরকারের সংস্কার পরিকল্পনা এবং সুপ্রিম কোর্টের কেয়ারটেকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা একসাথে সংবিধানের স্থিতিশীলতা ও কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। পরবর্তী ধাপগুলোতে বিচারিক স্বতন্ত্রতা, আইনসভার দায়িত্বশীলতা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণই সংবিধানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মূল চাবিকাঠি হবে।



