মার্চের শেষ শুক্রবার, যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনী সিরিয়ার পালমিরা অঞ্চলে এক আক্রমণ চালিয়ে আল-কায়েদা সংযুক্ত একজন উচ্চপদস্থ নেতাকে গুলি করে হত্যা করেছে। লক্ষ্যবস্তু বিলাল হাসান আল-জসিম, যাকে সেন্ট্রাল কমান্ডের সূত্রে আইএসআইএসের এক গুলিবিদ্ধের সঙ্গে সরাসরি সংযোগের অভিযোগ করা হয়েছে। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নীতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি পুনরায় আলোচনার মুখে।
আল-জসিমের সঙ্গে আইএসআইএসের গুলিবিদ্ধের সংযোগের বিবরণে বলা হয়েছে, ওই গুলিবিদ্ধ ১৩ ডিসেম্বর পালমিরাতে যুক্তরাষ্ট্র ও সিরিয়ার সৈন্যবাহিনীর ওপর হামলা চালিয়ে বহু প্রাণহানি ঘটিয়েছিল। সেই ঘটনার সময় তিনজন মার্কিন নাগরিক নিহত হয়েছিলেন, এবং সিরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীরও ক্ষতি হয়। এই তথ্যের ভিত্তিতে সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র আল-জসিমকে টার্গেট হিসেবে চিহ্নিত করে অপারেশন পরিচালনা করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার উল্লেখ করেন, “তিন মার্কিন নাগরিকের মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত সন্ত্রাসীর ধ্বংস আমাদের প্রতিরোধের দৃঢ়তা প্রকাশ করে।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, যারা যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায়, তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া অব্যাহত থাকবে। এই মন্তব্যটি রয়টার্সের মাধ্যমে প্রকাশিত একটি সরকারি বিবৃতিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
১৩ ডিসেম্বরের ঘটনার পর থেকে, যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্যবস্তু আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যে শতাধিক আইএসআইএস সংযুক্ত স্থানে হামলা করা হয়েছে, যার মধ্যে অস্ত্রাগার, প্রশিক্ষণ শিবির এবং আর্থিক নেটওয়ার্ক অন্তর্ভুক্ত। এই ধারাবাহিকতা সিরিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে এবং অঞ্চলের অন্যান্য শক্তিগুলোর দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি বাড়িয়ে দিয়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথও একই দিনে একটি সামাজিক মিডিয়া পোস্টে দেশের প্রতিরোধের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি “আমরা কখনো ভুলবো না, কখনো থামবো না” বলে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা নীতি তুলে ধরেন। এই বক্তব্যটি যুক্তরাষ্ট্রের সিরিয়ায় সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার ইচ্ছা স্পষ্ট করে।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, আল-জসিমের ধ্বংস আইএসআইএস ও আল-কায়েদা উভয়ের নেটওয়ার্কে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও তার সরাসরি সংযোগ আইএসআইএসের গুলিবিদ্ধের সঙ্গে ছিল, তবু তার আল-কায়েদা সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক অঞ্চলীয় সন্ত্রাসী সমন্বয়কে দুর্বল করতে পারে। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেন, একক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সামগ্রিক কাঠামোকে সম্পূর্ণভাবে ভাঙতে পারে না।
সিরিয়ার সরকার এই আক্রমণকে তার সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে নিন্দা করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা জানিয়েছে। রাশিয়া ও ইরান, যারা সিরিয়ার প্রধান মিত্র, একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপকে অবৈধ বলে সমালোচনা করেছে। তবে রাশিয়া ও ইরান উভয়ই সিরিয়ার ভূখণ্ডে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কার্যক্রম দমন করার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের আন্তর্জাতিক প্রভাবও স্পষ্ট। ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলো সাধারণত সিরিয়ায় সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইকে সমর্থন করে, তবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি আক্রমণকে সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। ন্যাটো সদস্য দেশগুলোও সিরিয়ায় সন্ত্রাসী হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগকে স্বীকৃতি দিয়েছে, তবে মানবিক পরিস্থিতি ও গৃহযুদ্ধের জটিলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সিরিয়ায় লক্ষ্যবস্তু আক্রমণ চালিয়ে যাওয়া হবে এবং নতুন সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের সন্ধান করা হবে। বিশেষজ্ঞরা অনুমান করেন, পরবর্তী কয়েক মাসে আরও অপারেশন হতে পারে, যার লক্ষ্য হবে আইএসআইএস ও আল-কায়েদা উভয়ের অবশিষ্ট ক্ষমতা হ্রাস করা। একই সঙ্গে, সিরিয়ার সরকার ও তার মিত্রদের সঙ্গে সম্ভাব্য কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংঘাতের তীব্রতা কমানোর চেষ্টা করা হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, মার্কিন বাহিনীর এই সাম্প্রতিক আক্রমণ সিরিয়ার নিরাপত্তা পরিবেশে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আল-জসিমের ধ্বংস সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, তবে একই সঙ্গে সিরিয়ার ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা বাড়িয়ে তুলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক সামরিক উপস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া ভবিষ্যতে অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



