সিলেটের এমজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল গত রোববার থেকে ইন্টার্ন ডাক্তারদের ২৪ ঘণ্টা অব্যাহত কর্মবিরতির মুখোমুখি হয়েছে। কর্মবিরতির মূল কারণ হল এক নারী ইন্টার্নের ওপর হামলা, যার পর হাসপাতালের প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতা না হওয়ায় ডাক্তাররা কাজ বন্ধ করে দেয়।
হামলার পরবর্তী দিনেই ইন্টার্ন ডাক্তাররা পুরো হাসপাতাল জুড়ে কাজ বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় এবং টানা এক দিন ধরে রোগী সেবা প্রদান বন্ধ রাখে। কর্মবিরতির প্রথম দিনই রোগীরা বিভিন্ন বিভাগে সেবা না পেয়ে কষ্টে পড়ে।
বিরতির সময়কালে ইন্টার্ন ডাক্তারদের সঙ্গে হাসপাতালের পরিচালক ও অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বৈঠক হয়। বৈঠকে দুই দফা আলোচনা শেষে ইন্টার্নরা কর্মবিরতি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
বৈঠকের পরেও কোনো সমঝোতা না হওয়ায় রোগীরা চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ৫ তলা ২২ নম্বর ওয়ার্ডে বুধবার জন্ম নেওয়া শিশুটিকে ভর্তি করা হয়েছিল হাবিগঞ্জের মো. রমজান মিয়া। তবে ইন্টার্ন ডাক্তারদের কর্মবিরতির ফলে শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় পরবর্তী পরীক্ষা ও চিকিৎসা সময়মতো করা সম্ভব হচ্ছে না।
একই সময়ে, ১৫ তলা গাইনিকোলজি ওয়ার্ডে পাঁচ দিন ধরে রোগী হিসেবে থাকা জুনেদ আহমদ তার স্ত্রীর সিজার ডেলিভারির পর জটিলতা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তার স্ত্রীকে এখনো ডাক্তার দেখছেন না, ফলে পূর্বে নির্ধারিত টিট্রামেন্টে বাধা সৃষ্টি হয়েছে।
অন্য একটি কেসে, ৪ তলা ৪ নম্বর সার্জারি ওয়ার্ডে রোগীর স্বজন সৌরভ জানান যে, গতকাল থেকে ডাক্তার পাওয়া যাচ্ছে না। রোগীর অপারেশন পরিকল্পনা ছিল, তবে রিপোর্ট দেখার জন্য কোনো ডাক্তারের উপস্থিতি নেই, ফলে রোগী ও তার পরিবার উদ্বেগে ভুগছে।
একই ওয়ার্ডে শুক্রবার রাতের সময় ইন্টার্ন ডাক্তার ও রোগী স্বজনদের মধ্যে কথোপকথন তীব্র হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত শারীরিক সংঘর্ষে রূপ নেয়। এই সংঘর্ষে অন্তত পাঁচজন আহত হয়, যার মধ্যে এক নারী ইন্টার্ন ডাক্তারও অন্তর্ভুক্ত।
পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করে। তবে পুলিশের হস্তক্ষেপের পরেও ইন্টার্ন ডাক্তারদের কর্মবিরতি অব্যাহত থাকে।
কর্মবিরতির পরবর্তী দিন, শনিবার দুপুরে হাসপাতালের পরিচালক ও অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ইন্টার্ন ডাক্তারদের সঙ্গে পুনরায় বৈঠক করেন। এক ঘণ্টার বেশি আলোচনার পর ইন্টার্নরা এখনও কাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত পুনর্ব্যক্ত করে।
হাসপাতালের প্রশাসন কর্মবিরতির প্রভাব স্বীকার করে এবং রোগীদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা প্রদান করতে অক্ষম বলে জানায়। ফলে রোগীরা দীর্ঘ সময়ের জন্য চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হয়, বিশেষ করে জরুরি ও গর্ভবতী রোগীদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
এই পরিস্থিতিতে রোগী ও তাদের স্বজনরা স্বাস্থ্য সেবার ধারাবাহিকতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। গরিব পরিবারগুলো বিশেষ করে চিকিৎসা খরচ ও যাতায়াতের সমস্যায় ভুগছে, কারণ ডাক্তার না থাকায় রোগের অবস্থা বাড়তে পারে।
হাসপাতালের কর্মী ও রোগী উভয়েরই নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যের দায়িত্ব নিশ্চিত করার জন্য দ্রুত সমাধান দরকার। ইন্টার্ন ডাক্তারদের দাবি হল নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং হিংসা-মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা, যা না হলে তারা কাজ চালিয়ে যাবে না।
অধিকন্তু, হাসপাতালের পরিচালনা পরিষদকে রোগীর সেবা বজায় রাখতে বিকল্প ব্যবস্থা গঠন করতে হবে, যেমন অস্থায়ীভাবে অভিজ্ঞ ডাক্তারদের নিয়োগ বা রোগীকে নিকটস্থ অন্য হাসপাতালে রেফার করা।
এই ঘটনায় স্বাস্থ্য সেবার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা এবং কর্মী-রোগী সম্পর্কের সুষ্ঠু সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি। রোগী ও ডাক্তার উভয়েরই স্বার্থ রক্ষার জন্য উভয় পক্ষের মধ্যে দ্রুত ও গঠনমূলক আলোচনা প্রয়োজন।
অবশেষে, রোগী ও তাদের পরিবারকে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত রাখা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা স্বাস্থ্য সেবার মৌলিক দায়িত্ব। আশা করা যায়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে কর্মবিরতি শেষ করে রোগীদের সেবা পুনরায় চালু করবে।



