জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ গত শুক্রবার হেডেসহাইমে অনুষ্ঠিত ক্রিস্টিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়নের (সিডিইউ) সমাবেশে উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে নিয়ম‑ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার থেকে সরে গিয়ে শক্তি ও স্বার্থ‑নির্ভর নীতির দিকে ঝুঁকছে। তিনি এ কথা বলেন, যখন যুক্তরাষ্ট্র এখনও ইউরোপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে বিবেচিত হয়।
মের্জের মতে, বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বড় মিত্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি এখন আন্তর্জাতিক আইনের ওপর ভিত্তি না করে, বরং নিজস্ব শক্তি ও স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এই পরিবর্তনকে তিনি ‘শক্তি‑নির্ভর রাজনীতি’ হিসেবে বর্ণনা করেন, যা পূর্বের নিয়ম‑ভিত্তিক পদ্ধতির থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ইউরোপের জন্য মের্জের সতর্কবার্তা স্পষ্ট: আর ‘মাথা বালিতে গুঁড়িয়ে রাখা’ বা কোনো ভূ‑রাজনৈতিক কোণে সরে গিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করা সম্ভব নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এমন কৌশল শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হবে এবং ইউরোপকে আরও দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী ভূমিকা নিতে হবে।
চ্যান্সেলর মের্জ ইউরোপীয় দেশগুলোকে আহ্বান করেন, যাতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তনশীল নীতির মুখে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তিনি যুক্তি দেন, ইউরোপ যদি নিজের স্বার্থকে ছোট করে রাখে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে তা কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যাবে।
ট্রান্স‑আটলান্টিক সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা নিয়ে মের্জ মন্তব্য করেন, যে শুধুমাত্র সমালোচনা করা যথেষ্ট নয়; যদি ওয়াশিংটন নিজের পথেই অটল থাকে, তবে ইউরোপের কোনো প্রভাব থাকবে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইউরোপকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমান ভাষায় কথা বলতে হবে, তবেই সম্মান অর্জন করা সম্ভব।
ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস এবং ফিনল্যান্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হওয়া পণ্যের ওপর ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হবে।
ট্রাম্পের দল এই শুল্কের হারকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সম্ভাবনা উল্লেখ করেছে, এবং কোনো পারস্পরিক সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত এই শুল্ক বজায় থাকবে। এই পদক্ষেপের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্ব উল্লেখ করে, প্রয়োজনে শক্তি ব্যবহার করার সম্ভাবনাও বাদ দেননি। এই মন্তব্য ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে, কারণ শুল্কের ফলে বাণিজ্যিক চাপ বাড়বে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতৃত্ব এই শুল্কের প্রভাব মূল্যায়ন করে, সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া হিসেবে শুল্কের পাল্টা ব্যবস্থা বা আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা চাওয়ার কথা প্রকাশ করেছে। মের্জের সতর্কবার্তা এবং ট্রাম্পের শুল্ক নীতি একসাথে ইউরোপকে তার নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ ইউরোপের জন্য একটি সংকেত, যে ভবিষ্যতে ট্রান্স‑আটলান্টিক সম্পর্কের ভারসাম্য পুনর্গঠন প্রয়োজন হতে পারে। মের্জের আহ্বান অনুযায়ী, ইউরোপকে নিজের স্বার্থ রক্ষার জন্য আরও স্বতন্ত্র ও দৃঢ় নীতি গড়ে তুলতে হবে।
এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় দেশগুলো শুল্কের প্রভাব কমাতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন বাণিজ্যিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা করার সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলছে। একই সঙ্গে, নিরাপত্তা ক্ষেত্রে ইউরোপের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ক্ষমতা শক্তিশালী করার জন্য সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তীব্রতর হয়েছে।
মের্জের বক্তব্য এবং ট্রাম্পের শুল্ক নীতি উভয়ই ইউরোপের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত নির্দেশ করে, যেখানে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশল পুনর্গঠন করা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে ইউরোপের অবস্থান কীভাবে গড়ে উঠবে, তা নির্ভর করবে তার স্বতন্ত্র নীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয়ের মাত্রার ওপর।



