গত শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে ‘কুয়াশার গান’ শিরোনামে একটি সঙ্গীত কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয়। এই অনুষ্ঠানটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এবং ‘স্পিরিট অব জুলাই’ নামে একটি প্ল্যাটফর্মের যৌথ উদ্যোগে আয়োজন করা হয়েছিল। কনসার্টের মূল উদ্দেশ্য ছিল ছাত্র-ছাত্রীদের সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক মঞ্চ প্রদান করা, তবে অনুষ্ঠানের পরই একটি বিতর্কের সূচনা হয়।
কনসার্টের মাঠে একটি স্টল স্থাপন করা হয়েছিল, যেখানে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে সিগারেট প্রদান করা হয়েছিল। স্টলটি সিগারেটের প্যাকেটগুলোকে বিনামূল্যে বিতরণ করে, ফলে অনেক ছাত্রই তা গ্রহণ করে। এই বিনামূল্যের বিতরণটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র সমালোচনা সৃষ্টি করে।
অনলাইন আলোচনায় শিক্ষার্থীরা উল্লেখ করেছে যে, বিনামূল্যে সিগারেট বিতরণটি ধূমপান নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। তারা দাবি করে যে, এমন কার্যক্রম ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫ (সংশোধিত ২০১৩) এর বিধানকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে।
ধারা ৫(খ) অনুযায়ী, তামাকজাত দ্রব্যকে বিনামূল্যে বিতরণ বা অল্প মূল্যে বিক্রি করা নিষিদ্ধ, কারণ তা ক্রেতাকে প্রলুব্ধ করার উদ্দেশ্য বহন করে। একই ধারা (৫(গ)) স্পষ্টভাবে বলে যে, তামাকজাত দ্রব্যের প্রচার, বিজ্ঞাপন বা ব্যবহার উৎসাহিত করার জন্য কোনো দান, পুরস্কার, বৃত্তি বা অনুষ্ঠানের ব্যয়ভার বহন করা অপরাধ। এই ধারা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা এক লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা আরোপ করা হতে পারে।
অধিকন্তু, ধারা ৬(খ) নির্ধারণ করে যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ক্লিনিক, খেলাধুলার স্থান এবং শিশুপার্কের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত দ্রব্যের বিক্রি হলে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। কনসার্টের স্থানটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠ, যা এই সীমার মধ্যে পড়ে, ফলে আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিতরণটি আরও সমস্যাযুক্ত হয়ে ওঠে।
বিনামূল্যে সিগারেট বিতরণে শিক্ষার্থীদের অভিযোগের লক্ষ্য সরাসরি ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মোসাদ্দিক আলীর দিকে ঘোরে। শিক্ষার্থীরা জানান যে, তিনি এই বিতরণে সরাসরি জড়িত ছিলেন না, তবে তার পদবী ও দায়িত্বের কারণে তিনি দায়িত্বের কেন্দ্রে ছিলেন।
মোসাদ্দিক আলী ফেসবুকে একটি পোস্টে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং স্পষ্ট করেন যে, কনসার্টের আয়োজনের সময় তিনি শুধুমাত্র একমাত্র ডাকসু প্রতিনিধিরূপে যুক্ত ছিলেন। তিনি স্পন্সর সংস্থা ‘এক্স ফোর্স’ এর সঙ্গে কোনো চুক্তি বা শর্ত নির্ধারণে ব্যক্তিগতভাবে অংশগ্রহণ করেননি। পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন যে, এক্স ফোর্সের পক্ষ থেকে একটি ‘স্মোকিং জোন’ তৈরি করার পরিকল্পনা ছিল, যাতে ধূমপানের কারণে অন্য অংশগ্রহণকারীদের কোনো অসুবিধা না হয়।
মোসাদ্দিক আলী বলেন, কনসার্টের পুরো সময় তিনি গেস্ট ও স্টেজ ম্যানেজমেন্টে ব্যস্ত ছিলেন এবং মাঠে কী ঘটছে সে সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন না। তিনি কনসার্টের শেষের দিকে ফেসবুকে এই বিতরণ সম্পর্কে জানেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে দায়িত্ব স্বীকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি জানাতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
স্পন্সর ‘এক্স ফোর্স’ দাবি করে যে, তাদের উদ্দেশ্য ছিল কেবলমাত্র একটি নির্দিষ্ট এলাকায় ধূমপান অনুমোদন করা, যাতে কনসার্টের অন্যান্য অংশগ্রহণকারীদের ওপর প্রভাব না পড়ে। তবে আইন অনুসারে, এমন কোনো ‘স্মোকিং জোন’ তৈরি করলেও তামাকজাত দ্রব্যের বিনামূল্যে বিতরণ নিষিদ্ধ, এবং তা লঙ্ঘনের শাস্তি প্রযোজ্য।
এই ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে এসেছে: ক্যাম্পাসে এমন ইভেন্টের আয়োজনের সময় কীভাবে আইনগত দিকগুলোকে সঠিকভাবে বিবেচনা করা যায়? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ইভেন্ট পরিকল্পনার প্রাথমিক পর্যায়ে আইনগত পরামর্শ গ্রহণ করা এবং স্পন্সরদের সঙ্গে স্পষ্ট শর্তাবলী নির্ধারণ করা উচিত।
শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহারিক টিপস: ক্যাম্পাসে কোনো ইভেন্টে অংশ নেওয়ার আগে তার অনুমোদন পত্র, স্পন্সর চুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট আইনগত বিধানগুলো যাচাই করুন। যদি কোনো কার্যক্রমে ধূমপান, অ্যালকোহল বা তামাকজাত দ্রব্যের বিতরণ অন্তর্ভুক্ত থাকে, তবে তা আইনগতভাবে অনুমোদিত কিনা তা নিশ্চিত করুন। এভাবে ভবিষ্যতে অনিচ্ছাকৃত লঙ্ঘন এবং সংশ্লিষ্ট শাস্তি এড়ানো সম্ভব হবে।



